Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্রীরামকৃষ্ণ

দেখিতে দেখিতে সারদামণি সুষমামণ্ডিতা হইয়া চতুর্দশ বর্ষে উপনীত হইয়াছেন; এমন সময় প্রায় সাত বৎসর পরে গদাধর জন্মভূমি সন্দর্শনে আসিলেন। এই কয় বৎসরে তন্ত্র ও বেদান্তের কি কঠোর সাধনাই না তিনি করিয়াছেন!

শ্রীরামকৃষ্ণ
  • ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেখিতে দেখিতে সারদামণি সুষমামণ্ডিতা হইয়া চতুর্দশ বর্ষে উপনীত হইয়াছেন; এমন সময় প্রায় সাত বৎসর পরে গদাধর জন্মভূমি সন্দর্শনে আসিলেন। এই কয় বৎসরে তন্ত্র ও বেদান্তের কি কঠোর সাধনাই না তিনি করিয়াছেন! সাধনসমুদ্রের পরে আজ তিনি সহজাবস্থা লাভ করিয়া সদানন্দে নিমগ্ন; শ্রীরামকৃষ্ণ নামেই এখন তিনি সমধিক পরিচিত। সঙ্গে আসিয়াছেন তাঁহার তন্ত্রসাধনার গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণী এবং ভাগিনেয় হৃদয়। প্রতিবেশীরা বহুদিন পরে তাহাদের গদাধরকে পাইয়া আনন্দিত; তিনিও সকলের সঙ্গে প্রাণ খুলিয়া মেলামেশা ও হাসিখুশি করিয়া সৎপ্রসঙ্গ দ্বারা তাহাদের মন ঈশ্বরের দিকে টানিতে লাগিলেন। এই আনন্দের হাট পূর্ণ করিবার জন্য জয়রামবাটী হইতে সারদামণিকে কামারপুকুরে আনা হইল। এই সময়েই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে সহধর্মিণীরূপে গড়িয়া তুলিবার দিকে মন দিলেন। কি করিয়া প্রদীপের সলতে পাকাইতে হয়, কিভাবে কখন কাহার সহিত কেমন ব্যবহার করিতে হয়, কিভাবে ভগবানের ধ্যান-ধারণা করিতে হয়—সব তাঁহাকে শিখাইতে লাগিলেন। সারদামণিও নীরবে শিষ্যার মতো সব শিখিতে লাগিলেন।

Advertisement

একদিন জীবনের উদ্দেশ্য ও আধ্যাত্মিক সাধনা সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিলেন, ‘চাঁদমামা সকলেরই মামা, তেমনি ঈশ্বর ও সকলের অতি আপনার, যে তাঁকে মনে প্রাণে ভালবাসে, ডাকে, সে-ই তাঁর দেখা পায়; তুমি যদি ডাকো, তুমিও তাঁর দেখা পাবে; আর তাঁর দেখা পাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য,—নতুবা জীবন বৃথা।’
শ্রীরামকৃষ্ণের এই প্রেমপূর্ণ কথাগুলি সারদামণির অন্তরে প্রবেশ করিল এবং তাঁহার জীবনের পরতে পরতে মিশিয়া গেল। তিনি তাঁহার পরমগুরু পতিকে জীবনের ধ্রুবতারা করিয়া এবং তাঁহার বাক্য মন্ত্রের মতো মনে করিয়া সাধনার পথে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। এই সময়ের কথা বলিতে গিয়া পরবর্তীকালে তিনি বলিয়াছেন, ‘তখন মনে হ’ত কে যেন হৃদয়ে একটি আনন্দের ঘট স্থাপন ক’রে রেখেছে!’ বুকের ভিতর আনন্দ, চোখে মুখে আনন্দ যেন উপচিয়া পড়িতেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের ভালবাসা পাইয়া, নিজেও তাঁহাকে ভালবাসিয়া সারদাদেবী আনন্দে ভরপুর হইয়া গেলেন।
সুখের সাতটি মাস সাতটি দিনের মতো কাটিয়া গেলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ফিরিয়া গেলেন দক্ষিণেশ্বরে, আর সারদাদেবী চলিয়া আসিলেন জয়রামবাটীতে। শয়নে-স্বপনে, ধ্যানে-জাগরণে তাঁহার সমগ্র সত্তা পরিপ্লুত করিয়া রহিল ঐ কয়মাসের সুখস্মৃতি। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, কে এই অপূর্ব মধুর পরমপুরুষ—লোকে যাঁহাকে পাগল বলে, যাঁহার স্ত্রী বলিয়া তাঁহাকে করুণার চোখে দেখে? কই, আমি তো পাগলের কিছু দেখিলাম না, বেশ সহজ স্বাভাবিক, তবে ঈশ্বরীয় কথায় মত্ত, ভগবদ্ভাবে বিভোর! কে এই দেবমানব, মহাসাধক আমার স্বামী! শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রীতিতে তাঁহার মন প্রাণ ভরিয়া উঠিল! একটা সার্থক গর্ব ও গৌরব সর্বদা তাঁহাকে ঘিরিয়া থাকিত, যাহার বলে সংসারী লোকের উপহাস তিনি নীরবে উপেক্ষা করিতে পারিতেন।
 
স্বামী নিরাময়ানন্দের ‘শ্রীশ্রীমা সারদা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ