Bartaman Logo
১৮ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সেটিং রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ...

তথাকথিত মেনস্ট্রিম রাজনীতিকদের হারিয়ে দিলেন আরশোলার ছাতার তলায় জড়ো হওয়া একঝাঁক মেধাবী যুবক। বিদেশ ঘোরা, আদ্যন্ত শিক্ষিত এবং লোভনীয় পদ নয়, হক আদায় করাই যাঁদের প্রথম ও শেষ অগ্রাধিকার।

সেটিং রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ...
  • ২৯ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তথাকথিত মেনস্ট্রিম রাজনীতিকদের হারিয়ে দিলেন আরশোলার ছাতার তলায় জড়ো হওয়া একঝাঁক মেধাবী যুবক। বিদেশ ঘোরা, আদ্যন্ত শিক্ষিত এবং লোভনীয় পদ নয়, হক আদায় করাই যাঁদের প্রথম ও শেষ অগ্রাধিকার। দুই তৃতীয়াংশ দূর অস্ত! সংসদে একজনও সদস্য না থাকলেও চলতি হাওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে কীভাবে দাবি ছিনিয়ে নিতে হয়, দেখিয়ে দিল জেন জি-দের এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। যুদ্ধে জিতে হুংকার, এ তো সবে শুরু! আগামীতে আরও হবে। সেইসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও জানিয়ে দিল, আন্দোলন দেখলেই পুলিশ লাঠি চালাতে পারে না। 

Advertisement

রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে ৯৩ বছর আগে লিখেছিলেন ‘আমরা নূতন যৌবনেরই দূত’। ভারতমাতার স্বাধীনতার ১৪ বছর আগে তাসের দেশের শৃঙ্খল ভেঙে কবিগুরু উড়িয়ে ছিলেন এক নতুন হাওয়া। আর এই ছাব্বিশ সালের জুলাই মাসের শেষ অর্ধে সেই বদলে দেওয়া হাওয়ার অভিঘাতে সর্বশক্তিমান বিশ্বগুরুর দর্পচূর্ণ হওয়া প্রত্যক্ষ করল জনগণ। তিরিশের আশপাশের একঝাঁক শিক্ষিতের সিস্টেমকে পালটে দেওয়ার নাছোড় প্রতিজ্ঞা। অনায়াসেই ঈর্ষণীয় কেরিয়ার বাগিয়ে দেশকে ভুলে এঁরা থাকতে পারতেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে প্রবাসে। তা না করে পথ বদলে দেশের মাটিতে! সোনাম ওয়াংচুক, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাংকা, অভিজিৎ দিপকে নামগুলো গত দেড়শো ঘণ্টায় ক্লিশে হয়ে যাওয়া সংসদীয় নেতানেত্রীদের চেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হয়েছে। খেদ, বিরক্তি এবং প্রত্যাখ্যানে নয়, অগাধ বিশ্বাস ও আস্থায় তাঁরা মানুষের মন দখল করছেন। আসলে দেশের এক নম্বর, দু’নম্বর, তিন নম্বর নেতানেত্রীদের হট্টগোল, সংসদে কুস্তি, বাইরে দোস্তির কুনাট্য মানুষ ধরে ফেলেছে। তাই সংসদ মুলতুবির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এই প্রজন্ম নজর রেখেছে যন্তরমন্তরের দিকে। কারণ সেটিংয়ে অভ্যস্ত আখের গোছানো দিনে দু’শোবার বাজারে হাটে বিক্রি হওয়া নেতানেত্রীদের একাংশের উপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে ক্রমেই। মানুষ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখছে, ভোটের প্রচারে যাকে পাচারকারী গুন্ডা তোলাবাজ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, ভোট মিটলেই তিনিই কেমন দুধেল বিদগ্ধ পণ্ডিতে পরিণত হয়ে শাসকের পাশের চেয়ারটা দখল করেন অবলীলায়! প্রকাণ্ড মালা আসে, যা থেকে ধীরে চুঁইয়ে পড়ে সৌরভ, কিন্তু গরিবের একটা রুটি জোটে না! ওরা তো আর বিল পাশ করাতে পারবে না! সেটিং হয়ে গেলেই এবং বিল পাশে সহযোগিতা করার পাকা কথা (পড়ুন পাকাদেখা!) সাঙ্গ হলেই আর একদা যাঁরা গুন্ডা ছিল তাঁদের উলটো করে ঝুলিয়ে মারার প্রয়োজনীয়তাও শেষ। ডিমথেরাপির থকথকে কাদা মুছে দিল্লিতে অপেক্ষা করে প্রকাণ্ড রথ। এই রং বদল আসলে মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা নয় কি! এই অশালীন খেলাটা ঘামে-রক্তে ভেজা দু’ফুট বাই দেড়ফুটের দোকান হারানো হকার থেকে গরিব প্রান্তিক দৃষ্টি হারানো সব শ্রেণির মানুষ ধরে ফেলেছে। দেশসেবার নামে বজ্জাতি! দেশের কাজ করার বাহানায় আগের এবং বর্তমান দু’টি রাজনৈতিক দলের প্রতীকের সঙ্গেই এই বিশ্বাসঘাতকতা কতদিন চলবে? বলুন তো গত আড়াই মাসে পশ্চিমবঙ্গে একটিও তোলাবাজির ঘটনা ঘটেনি! গুন্ডাগর্দি, ভয় দেখানো, সম্পত্তি লুট হয়নি। সব চলছে আগের মতোই! শুধু রং বদলেছে, ঢং পালটেছে, রেট কমেছে বেড়েছে। বাকি সব একই রয়েছে। সবাই সেটিং আহ্লাদে আত্মহারা, পেটে লাথি পড়েছে শুধু গরিব হকারের!
এই অচলায়তন ভাঙতেই আরশোলা, ই ২০ জনতা পার্টির আবির্ভাব। কে এঁরা? ২০১৮ সাল থেকে সাংবাদিকতাকে পেশা করেছেন সৌরভ দাশ। অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়কে নিয়ে সৌরভের প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। দেশ তো বটেই, সারা বিশ্বে সৌরভ এখন পরিচিত মুখ। সাংবাদিকতার আগে সৌরভ ছিলেন তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই কর্মী। সিজেপি-র আর এক মুখপাত্র আশুতোষ রাংকা। আইআইটি কানপুর এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের প্রাক্তনী থাকতেন লন্ডনে। বহুজাতিক সংস্থায় বড়ো পদে চাকরি করতেন। রাজস্থানের জয়পুরে পরিবেশ, শিক্ষা এবং যুব সম্প্রদায়ের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছেন। তাঁর দাবি, দেশে ফিরেছেন শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো ভালো কিছু করবেন বলে। পুণে থেকে সাংবাদিকতা নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন অভিজিৎ দিপকে। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা চলে যান। বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এর মাঝেই জড়িয়ে পড়েন ভারতের নিট কেলেঙ্কারি নিয়ে আন্দোলনে। সিজেপি-র আন্দোলনে শামিল হতে দেশে ফিরে আসেন দিপকে। গত ৬ জুন থেকে ২৫ জুলাই—বার বার সুর চড়িয়েছেন। এবং শেষে শিক্ষামন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু আন্দোলন কি থেমে যাবে? এখনও বিক্ষোভকারীদের চিহ্নিত করে ধরা হচ্ছে। জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা করছে পুলিশ। যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদেরও সবাইকে ছাড়া হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার যদি কথা না রাখে তবে আবার আন্দোলনের তেজ বাড়বে। আবার অচল হবে দিল্লি থেকে শুরু করে দেশের বড়ো বড়ো শহরের রাজপথ। নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদির কেরিয়ারের অগ্নিপরীক্ষা! কে জিতবে? সেটিং রাজনীতি না জেন জি-দের জেদ? আগামী ৬ মাস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ