নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: স্যাঁতস্যাঁত করছে মেঝে। ড্যাম ধরা দেওয়াল থেকে খসে পড়ছে চুন-রং। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম। দরদর করছে ঘামছে এসিতে অভ্যস্ত শরীর। মাথার উপর নেই সিলিং ফ্যানও। লোহার গেটের বাইরে রাখা স্ট্যান্ড ফ্যান। অথচ ঢিল ছোড়া দূরেই তাঁদের বাড়ি। একসময় সেলাম ঠোকার কর্মীর অভাব ছিল না। এখন বাইরে পা ফেললেই উড়ে আসছে পচা ডিম, পচা টম্যাটো, ‘শুদ্ধিকরণে’র লক্ষ্যে ছোড়া গোবর। রাজ্যে পালাবদলের পর সল্টলেকের একই থানার ছোট্ট লকআপে এখন দিন কাটছে রাজ্য তৃণমূলের সহ সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার, বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত, কাউন্সিলার রঞ্জন পোদ্দারদের। বিধাননগর উত্তর থানায় একঝাঁক নেতার সহাবস্থান একসঙ্গে। কর্মীও আছেন কয়েকজন। গোটা থানা যেন একদা শাসকদলের ‘ভাঙাহাট’। পালাবদলে প্রাপ্তি কেবল প্রতিরাতে মশার গুনগুন গান। সঙ্গে সল্টলেকের স্বাস্থ্যবান মশার কামড়।
শহরের বাসিন্দারা বলছেন, পালাবদলের পর সল্টলেকের বিধাননগর উত্তর থানার ‘টিআরপি’ এখন সবচেয়ে উপরে! প্রায় দিনই কেউ না কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছেন এই থানায়। সঙ্গে ডিম-টম্যাটো দিয়ে ‘বরণের’ ট্রেন্ডও চলছে! কেন? আগে চাঁদের হাট বসলেও এখন ক্ষমতা হারানো তৃণমূল নেতাদের ‘ভাঙা হাট’! গত ২০ মে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার তথা ৫ নম্বর বরো চেয়ারম্যান রঞ্জন পোদ্দার, ৩ জুন তৃণমূলের সহ সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার, ৮ জুন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত এই বিধাননগর উত্তর থানাতেই গ্রেপ্তার হন। সব্যসাচীবাবু বিধাননগরের প্রাক্তন ও প্রথম মেয়র এবং রাজারহাট-নিউটাউনের দু’বারের বিধায়কও। ৩০ মে এই থানায় গ্রেপ্তার হয়েছেন মেয়র পারিষদ তুলসি সিনহা রায়ের স্বামী ভাস্কর সিনহা রায়। সবার বিরুদ্ধেই তোলাবাজির অভিযোগ। জয়প্রকাশের বিরুদ্ধে তোলাবাজির সঙ্গে শ্লীলতাহানি, প্রতারণা, মারধর প্রভৃতি একাধিক অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও এই থানায় তোলাবাজির অভিযোগে তৃণমূলের আরও ৫-৬ জন চেনা কর্মীও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন আবার সব্যসাচী ঘনিষ্ট এবং আর একজন মেয়র পারিষদ ঘনিষ্ট। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাস্করবাবু জামিন পেয়েছেন। তবে পুলিশ হেপাজতে রয়েছেন সব্যসাচী, জয়প্রকাশ, রঞ্জনেরা। সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মী। জয়প্রকাশ এবং রঞ্জন একই লকআপে। পাশের লকআপে একা রয়েছেন সব্যসাচী। মন-মরা। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। পাশের লকআপে রয়েছেন চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত। তাঁরা অন্য সময় গ্রেপ্তার হলে ঘাপটি মেরে গুটিয়ে থাকতেন। এই বুঝি দারোগা সাহেব এসে কষিয়ে দিলেন গালে। এখন তাঁদের পাশে চেনা সব নেতারা। টিভিতেই দেখা যেত তাঁদের। নেতাদের সঙ্গেই দিন কাটছে ‘কানকাটা’, ‘হাতকাটা’দের। আগেও মশার কামড় ছিল। এখনও মশার কামড়। কিন্তু ছিঁচকেদের মুখে এক অদ্ভূত হাসি। যে মশা তাদের কামড়াচ্ছে, সেই একই মশা কামড়াচ্ছে নেতাদেরও! জামিন পেয়ে ফিরে গিয়ে তারাও বলবে, আমাদের পাশের লকআপে সব্যসাচী-জয়প্রকাশও ছিলেন।