নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: নবান্ন থেকে আধিকারিকরা বীরভূমের দেউচা-পাচামি পাথর শিল্পাঞ্চলে পরিদর্শনে আসায় ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব সহ একঝাঁক উচ্চপদস্থ আধিকারিক শুক্রবার এলাকায় গিয়ে তদন্ত চালান। উপস্থিত ছিলেন মহম্মদবাজার ব্লকের ভূমি সংস্কার দপ্তরের কর্তারাও। প্রশাসন সূত্রের খবর, সম্প্রতি নবান্নে মহম্মদ মসিরউদ্দিন নামের এক ব্যক্তির ইমেল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি অভিযোগ পাঠানো হয়। দাবি করা হয়, পাচামিতে অন্তত ৯টি পাথর খাদান সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বুক ফুলিয়ে চলছে। সেই অভিযোগের ফাইল খতিয়ে দেখতেই এই পরিদর্শন।
ভূমি দপ্তর সূত্রের খবর, ওই ইমেলের ভিত্তিতে মহম্মদবাজার ব্লকের ভূমি আধিকারিকরা নির্দিষ্ট ৯টি খাদানে তদন্ত চালান। দেখা যায়,খাদানগুলি সম্পূর্ণ অবৈধ। এর মধ্যে কয়েকটি খাদান তো রয়েছে একেবারে স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের গা ঘেঁষে। যা শুধু গ্রামীণ পরিবেশই নয়, শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাকি প্রায় ৭টি খাদান চলছে খোদ পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের (ডব্লিউবিপিডিসিএল) জমিতে। বিদ্যুৎ নিগম অনেক আগেই এগুলিকে বন্ধের নোটিস পাঠিয়েছিল, কিন্তু লাল ফিতের ফাঁস গলে এবং সরকারি নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেখানে দিনরাত এক করে রমরমা কারবার চলছিল। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, বন্ধের নোটিস থাকা সত্ত্বেও কার ইশারায় এই খনি সাম্রাজ্য সক্রিয় ছিল?
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, প্রশাসন, পুলিশ এবং কিছু প্রভাবশালী নেতার পকেট গরম করেই বীরভূমের এই অবৈধ কারবার কায়েম রেখেছেন পাথর ব্যবসায়ীরা। যদিও সূত্রের খবর, শুক্রবার রাজ্য থেকে পরিদর্শকরা আসার ঠিক আগের মুহূর্তে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে ওই খাদানগুলোকে তড়িঘড়ি বন্ধের নির্দেশ পাঠিয়েছে মহম্মদবাজারের ভূমি দপ্তর। তবে সমালোচকদের তীব্র খোঁচা, ‘এ তো আসলে নামেই বন্ধের নোটিস, তলে তলে দর বাড়ানোর সুনিপুণ কৌশল মাত্র!’ স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযোগকারী মহম্মদ মসিরউদ্দিন হলেন বীরভূমের দাপুটে তৃণমূল নেতা তথা খনি মালিকদের সংগঠন ‘পাচামি মাইন্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর কার্যকরী সভাপতি। পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের দাদা। তবে মসিরউদ্দিনের সাফ দাবি, ‘আমি এমন কোনো ইমেল পাঠাইনি। আমাকে সামাজিকভাবে বদনাম করতেই আমার নাম ব্যবহার করে এই জাল ইমেল পাঠানো হয়েছে।’ ইতিমধ্যেই তিনি এ নিয়ে অতিরিক্ত জেলাশাসকের (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) কাছে পাল্টা লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। বীরভূম জেলায় এই মুহূর্তে সরকারি খাতায় বৈধ খাদানের সংখ্যা খুব জোর ১০-১২টি, অথচ বেআইনি খাদানের সংখ্যা ৫০০ পার করে গিয়েছে। অথচ এই অবৈধ খাদানগুলি থেকেই কোটি কোটি টাকার জরিমানা আদায় করে রাজ্য সরকার নিজেদের কোষাগার ভরায়। তাই পাথর কারবারিদের একাংশের স্পষ্ট দাবি, ‘এভাবে বন্ধের নোটিস পাঠানো শুরু করলে ঠগ বাছতে তো গাঁ উজাড় হয়ে যাবে!’ ক›জনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে প্রশাসন? সিংহভাগ খাদানই তো এখানে অবৈধ। অথচ এই অবৈধ কারবারের জেরে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। বেআইনি খাদানে প্রায়শই ধস নেমে বহু গরিব আদিবাসী শ্রমিকের অকালমৃত্যু হয়েছে। কোথাও আদিবাসীদের জমি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তো কোথাও সবুজ কৃষিজমি রাতারাতি উধাও হয়ে গিয়েছে। যদিও পাথর কারবারিদের পাল্টা যুক্তি, এই অবৈধ কারবারের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার গরিব মানুষের পেটের ভাত ও কর্মসংস্থান।