Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রূপচর্চায় টক দই

রূপচর্চায় টক দই
  • ১০ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শৈশব জীবনে দইয়ের সঙ্গে সখ্য করতে গেলে বাঙালিকে রবীন্দ্রনাথের শরণ নিতেই হয়। স্কুলপাঠ্য ‘সহজ পাঠ’ খুলে বাড়ির খুদে সদস্য জোরে জোরে পড়া মুখস্থ করে, ‘বাটি হাতে এ ঐ/ হাঁক দেয় দে দৈ’। বাঙালি বাড়িতে খাবার পাতে একসময় এই দধি বা দইয়ের আলাদা কদর ছিল। মিষ্টির দোকানের দইয়ের চেয়ে বাড়িতেই দই তৈরি করতেন বাংলার গৃহিণীরা। তবে বাংলার ঘরে পাতা দই বলতে মূলত টক দইকেই বোঝাত। আজও প্রখর দাবদাহে প্রায় সব গৃহস্থবাড়িতে খাবারের পাতে থাকে ঘরে পাতা অথবা দোকানের টক দই। গরমে হজমশক্তি বাড়াতে, পেটের সমস্যা দূর করতে দইয়ের জুড়ি মেলা ভার। তবে শুধু খাওয়ার কাজেই নয়, দই যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে এসেছে রূপচর্চাতেও।

Advertisement

 
দইকে প্রসাধনের কাজে প্রথম ব্যবহার করে মিশরীয় ও গ্রিকরা। ত্বক উজ্জ্বল করতে ও ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে তারা দইয়ের মাঠা রূপচর্চার অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করত। গরমে আমাদের ত্বককে এমনিতেই অনেক বেশি অত্যাচার সহ্য করতে হয়। সূর্যের তাপ, ঘাম, জলীয় বাষ্পের আধিক্যে ভ্যাপসা গরম সবই ত্বকের উপর দিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শুষ্ক ও তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীরা। তাই এই মরশুমে চাই ত্বকের বাড়তি খেয়াল। একটুখানি টক দই-ই হয়ে উঠতে পারে ত্বকের নানা সমস্যার দাওয়াই। 


এই প্রসঙ্গে রূপবিশেষজ্ঞ কেয়া শেঠ জানালেন, ‘তৈলাক্ত ত্বকে ব্রণর সমস্যা প্রায় সারা বছরের ভোগান্তি। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ব্রণর উপদ্রব বেড়ে যায়। টক দই অন্যান্য উপকারের সঙ্গে ব্রণ কমাতে ভীষণ সাহায্য করে। সরাসরি দই ব্রণর উপর লাগাতে পারেন। অনেকে আবার চন্দন অথবা মধুর সঙ্গে মিশিয়েও ব্যবহার করেন। এই মিশ্রণ ব্রণর জায়গায় লাগিয়ে রেখে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে। দিনকয়েক ব্যবহারের পর উপকার মিলবে। এমন নানা উপায়েই টক দই রোজ ব্যবহার করা যায়, এটি সহজলভ্যও। খরচসাপেক্ষও নয়। তাই বাঙালির রূপচর্চায় এই উপাদানের ব্যবহার বেশ প্রাচীন।’


মুশকিল আসান দই


টক দই শুধুমাত্র ব্রণর সমস্যা দূর করে না, ব্রণর দাগ, ত্বকের নানা পুরনো দাগছোপও সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিডের সঙ্গে লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড যোগ করলে তা ব্রণ বা অ্যাকনের দাগ, পুরনো কোনও কালো ছোপ দূর করতে পারে। সেক্ষেত্রে তিন চামচ দইয়ের সঙ্গে এক চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে মুখের দাগগুলোয় লাগিয়ে রাখুন। মিনিট ১৫ পর জল দিয়ে ধুয়ে দিন। ত্বক খুব স্পর্শকাতর হলে অনেকেই লেবুর রস ব্যবহার করতে চান না, সেক্ষেত্রে ১ টেবিল চামচ টক দই তুলোয় নিয়ে ব্রণর উপরে লাগিয়ে রাতভর রেখে দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা জলে ধুয়ে ফেলুন মুখ। দিন কয়েক করার পর দেখবেন, দইয়ের মধ্যে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্রণ কমায়। 


শুধু অ্যাকনে বা ব্রণই নয়, কেয়া শেঠ জানালেন, ইদানীং চোখের তলায় কালি পড়াও একটি বড় সমস্যা। লিভারের সমস্যা না থাকলেও বর্তমানে বহু মেয়েকেই রাত জেগে অফিস করতে হয়। তার উপর রয়েছে রাত জেগে ওটিটি দেখার ঝোঁক। ফলে চোখের তলায় কালি পড়ে। এসব ক্ষেত্রেও টক দই দারুণ উপযোগী। টক দইয়ে তুলো ডুবিয়ে চোখের উপর লাগিয়ে চোখ বুঝে শুয়ে থাকুন। এতে চোখের নীচের ফোলাভাব কমে, চোখের কালিও দূর হবে। 


ত্বকের তেলতেলে ভাবও সমস্যা তৈরি করে। বেশি তৈলাক্ত ত্বক হলে ব্রণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে ত্বকের দেখভাল করার জন্য ১ চামচ টক দইয়ের বেসের উপর ভালো করে ফেটিয়ে মিশিয়ে নিন ডিমের সাদা অংশ। কিছুক্ষণ রাখার পর ত্বক টানতে শুরু করার আগেই ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন। এই মিশ্রণ নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকে তেলাভাব কমবে।

 
দই দিয়ে স্ক্রাব


আধুনিক রূপচর্চায় দইয়ের সঙ্গে ওটমিলের ব্যবহারও বেশ বেড়েছে। ওটমিল প্রাকৃতিক স্ক্রাবার। তবে শুষ্ক ত্বক হলে অনেকেই শুধু ওটমিলে ভরসা করেন না। সেক্ষেত্রে দই খুব ভালো কাজে আসে। তাই ১ চামচ টক দইয়ের সঙ্গে ১ চামচ ওটমিল মিশিয়ে একটা ঘরোয়া স্ক্রাবার তৈরি করে নিন। রোদ থেকে ফিরে এসে এই ফেস স্ক্রাব মুখে ঘষে নিন। এতে বলিরেখা কমবে, দাগ, ভাঁজ সহজে মেরামত হবে। ত্বকের কোলাজেন বৃদ্ধি পাবে। মৃতকোষ দূর হয়ে মুখ হয়ে উঠবে উজ্জ্বল। 
এছাড়া দইয়ের সঙ্গে ওয়ালনাট বা আখরোট গুঁড়ো মিশিয়েও ভালো স্ক্রাব তৈরি করতে পারেন। এটিও সব ধরনের ত্বকের জন্য বিশেষ উপকারী। বিভিন্ন প্রসাধন প্রস্তুতকারী সংস্থা তাঁদের পণ্যে দইয়ের এক্সট্র্যাক্ট ও ওটমিল ব্যবহার করে। 
মেকআপ করার পর
যাঁরা নিয়মিত মেকআপ করেন বা রোদের মধ্যে কাজ করতে হয়, টক দই তাঁদের ত্বকের জন্যও খুব কার্যকরী উপাদান। রোদের তাপে ও ক্রমাগত মেকআপ ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে 


১ চামচ টক দইয়ের সঙ্গে ১ চামচ টম্যাটোর রস ও 
১ চামচ মধু মিশিয়ে একটা ঘরোয়া প্যাক তৈরি করে নিন। টম্যাটো প্রাকৃতিকভাবে ট্যান দূর করে। মধু ফিরিয়ে আনে ত্বকের জৌলুস। এর সঙ্গে টক দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড মিশে ত্বকের পোড়াভাব ও ট্যান কমিয়ে ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে। 
গরমের রুটিনে ঘরোয়া এই উপাদান অল্প ব্যবহার করেই যত্ন নিতে পারেন নিজের। প্রয়োজন শুধু নিজেকে ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত একটি মন ও দিনের মধ্যে মিনিট পনেরো সময়! 


                                মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ