নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: চারিদিকজুড়ে সাদা বরফ। তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার সঙ্গে তুষারপাত এবং জলের অভাব। এই অমানুষিক পরিস্থিতিতে পর্বতারোহী ‘সোনারপুর আরোহী’ দল পৌঁছল দুর্গম লাদাখের চ্যাং চেনমো কাঙ্গরিতে। তারা চারটি শৃঙ্গ জয় করেছে। যার তিনটিই সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত (ভার্জিন পিক)। তিনটি শৃঙ্গের নামকরণ হয়েছে ‘তেনজিং নোরগে’, ‘এডমন্ড হিলারি’ এবং ‘নেতাজি সুভাষ’এর নামে। এ সংক্রান্ত সম্মতিও পেয়ে গিয়েছেন তাঁরা। দলটির মতে, ‘এই প্রথম এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হল।’ আরোহী জানিয়েছে, ভার্জিন পিক অভিযান শুরু ৯ সেপ্টেম্বর। বিকেল তিনটে নাগাদ নৈতিক নস্কর, দেবাশীষ মজুমদার ও দীপাশ্রী পাল ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার পিক আরোহণ করেন। ওয়েষ্ট রিজ দিয়ে ক্লাইম্ব করে ইষ্ট রিজ দিয়ে অবতরণ করেন তাঁরা। এরপর অভিযানের মূল গন্তব্য, ‘চ্যাং চেনমো কাঙ্গরি’। সেটির উচ্চতা ৬ হাজার ৫৩৬ মিটার। ১১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চ্যাং হিমবাহের কাছে তৈরি করা একনম্বর ক্যাম্প থেকে ৯ ক্লাইম্বার রওনা দেন। সে আরোহণ দীর্ঘ ও কঠিন। বিকেল ৫টা ৩০ নাগাদ অবশেষে প্রায় অসাধ্যসাধন। চ্যাং চেনমো কাঙ্গরির চূড়ায় পা রাখলেন পর্বতারোহীরা। এরপর বিরতি। ১৪ সেপ্টেম্বর অভিযানের অন্যতম কঠিন পর্বে প্রবেশ। রাত ১২টা ৩০ মিনিটে ক্যাম্প থেকে আট ক্লাইম্বার হিমবাহের দিকে যাত্রা
শুরু করেন। রাত আড়াইটে নাগাদ ৫ হাজার ৯০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছন। তারপর ওই প্রবল ঠান্ডায় খোলা হিমবাহের উপর সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়
রাত কাটান একপ্রকার বাধ্য হয়ে। দলটির ভরসা বলতে ছিল সারভাইভাল শিট ও রেনকোট।
কিন্তু ভোরবেলাও আবহাওয়ার উন্নতি নেই। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। আচমকা তুষারপাত শুরু। শেষে নিরাপত্তার কথা ভেবে পরের অভিযান বাতিল করে দলটি ক্যাম্পে ফিরে আসে। তখন থার্মোমিটার জানাচ্ছে, তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে এসেছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া পরিস্থিতি অসহনীয় করে তুলেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর চ্যাং চেনমো হিমবাহের উপর ৫ হাজার ৯০০ মিটার উচ্চতায় দ্বিতীয় ক্যাম্প তৈরি করলেন তাঁরা। পরেরদিন, ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু করেন যাত্রা। বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে ৬ হাজার ৪২০ মিটার উচ্চতার একটি ভার্জিন পিকে আরোহণ সফল। অভিযানের শেষ বড়ো পর্বটি ছিল ২০ সেপ্টেম্বর। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ১৪ সদস্যের দলটি যাত্রা শুরু করে। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ৬ হাজার ২৭৪ মিটার উচ্চতার অন্য একটি
ভার্জিন পিক আরোহণ করেন। সোনারপুর আরোহী জানিয়েছে, কোনো শৃঙ্গে উঠতে স্থায়ী দড়ি ব্যবহার হয়নি। শৃঙ্গের ঢালের মাত্রা ছিল ৫৫ থেকে ৭৫ ডিগ্রি। প্রতিটি শৃঙ্গে আরোহণের সময় যে রুট ব্যবহার হয়েছে অবতরণে সে একই পথে
যাওয়া হয়নি। অভিযানের অন্তিম পর্যায়ে বেস ক্যাম্পে জলসংকট তীব্র আকার নিয়েছিল।
১৪ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাছে থাকা নালাটিতে জল প্রবাহিত হয়নি। তাই রোজ ৪০০ মিটার দূরে গিয়ে জল আনতে হত। কখনো ১ কিমি দূরে গিয়ে ১০০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করে হিমবাহের বরফ সংগ্রহ করে তা গলিয়ে জল তৈরি করতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, এভারেস্ট আরোহণের ৭৫ বছর পূর্তির সময় এসে গিয়েছে। এখনও তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারির নামে কোনো পর্বত নেই বিশ্বে। এবার প্রথম ৬ হাজার ৪০০ মিটারের আরোহিতের নামকরণ হল হিলারির নামে। তৃতীয় আরোহিত ৬ হাজার ৪২০ মিটারটির নামকরণ হল নোরগের নামে। অন্যটির নাম হল নেতাজির নামে।