সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: সারা জীবন কেটেছে কয়লা খনিতে। মোটা অঙ্কের টাকা মাস মাইনে পেতেন। কিন্তু জীবন ছিল দুর্বিষহ। প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে হতো দানবের সঙ্গে। রক্ত জল করা পরিশ্রমের পয়সায় ছেলেকে পড়াতেন ভালো স্কুলে। আর স্বপ্ন দেখতেন, ছেলে একদিন বড় হবে। ভালো চাকরি করবে। জমানো টাকায় আমি অবসর জীবন কাটাব অভিজাত সোসাইটিতে।
স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরিয়েও গিয়েছিলেন ওই খনিকর্মীর। ছেলে পড়াশোনা করে চাকরি পেলেন নাগপুরের এক নামজাদা বহুজাতিক সংস্থায়। মস্ত বড় অফিসার হলেন। মোটা মাইনে। বিয়েটাও সেরে ফেললেন। স্ত্রীও ওই সংস্থায় চাকরি করেন। দু’জনের মাসে আয় লক্ষ লক্ষ টাকা। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। তারপর একদিন ছেলে-বউমা অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ খনিকর্মীকে স্বপ্ন দেখালেন, আসানসোলে আর নয়। এবার মা আর তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। নাগপুরে বিশাল বাড়ি কিনব। সেখানে সবাই মিলে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকব। তুমি তো এটাই চেয়েছিলে। বৃদ্ধ ছেলের কথায় বিশ্বাসও করে নেন। এরপর সুযোগ বুঝে কোপ। ছেলে-বউমার প্রস্তাব মেনে সারা জীবনের সঞ্চয় থেকে ৪০ লক্ষ টাকা তুলে দেন বৃদ্ধ। নাগপুরে বাড়ির দাম তো আর কম নয়!
ব্যাস! টাকা নিয়ে সেই যে গেলেন অফিসার ছেলে আর ফিরে আসেননি। ছোটবেলায় ছেলেকে বড় আদর করে ডাকতেন ‘বাবু’। সেই ‘বাবু’ টাকা বাপের টাকা নিয়েই ভো-কাট্টা। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেন না। ফোনেও ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রায় দেড় বছর ছেলের পথ চেয়ে বসেছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। ভাবতেন এই বুঝি আসানসোলে এসে দু’জনকে নাগপুরে নিয়ে যাবেন। না, গুণধর ছেলে আর আসেননি। অবশেষে আসানসোলের মহকুমা শাসকের দ্বারস্থ হয়েছেন বৃদ্ধ। ছেলের কীর্তি খুলে বলেন এসডিওকে। চোয়াল শক্ত করে বিচার চেয়েছেন। বৃদ্ধের আর্জি, ইসিএলের পেনশন অত্যন্ত কম। ওষুধের খরচ টুকু চালাতে পারছি না। ছেলে- বউমাকে বার বার বলেও কোনও সুরাহা পাচ্ছি না।
মেইনটেনেন্স অ্যাণ্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্ট অ্যাণ্ড সিনিয়র সিটিজেন অ্যাক্টে হওয়া অভিযোগের শুনানির উদ্যোগ নিয়েছেন মহকুমা শাসক। বৃদ্ধের অভিযোগটিও এই অ্যাক্ট অনুযায়ী গৃহীত হয়েছে। শুনানির জন্য দু’পক্ষকে ডাকা হচ্ছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। যদিও আশঙ্কা, নাগপুরে উচ্চ বেতনের দম্পতি কি শুনানিতে হাজির হতে আসানসোল আসবেন? কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে যাতে শুনানি এড়িয়ে না যেতে পারেন তার জন্য কোমর বাঁধছে মহকুমা প্রশাসন। ভার্চুয়াল মাধ্যমেও তাঁদের শুনানিতে হাজির করানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রশাসন চাইছে, বৃদ্ধকে সঠিক বিচার দিতে। যদিও তাঁদের দাবি বৃদ্ধ একা নন, প্রতি মাসেই পাঁচ থেকে ছ’টি এই ধরনের অভিযোগ জমা পড়ছে মহকুমা শাসকের কাছে। কোথাও ছেলের বিরুদ্ধে জোর করে সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ। কোথাও আবার অবসরের টাকা হাতিয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে পথে বসানোর অভিযোগ। শেষে নিঃস্ব বাবা-মায়ের ভরসা হয়ে উঠছে মহকুমা শাসকের দপ্তর। কারণ, এই অ্যাক্টের মামলায় আইনজীবীর প্রয়োজন হয় না। দু’পক্ষকেই নিজেদের সওয়াল করতে হয়। এতে আইনজীবীর খরচ বাঁচে। বৃদ্ধ বাবা, মায়ের আর্থিক চাপ থাকে না। আসানসোলের মহকুমা শাসক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ভাবে শুনানি করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। ‘বাগবান’ সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন এমনই এক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেখানে দেখানো হয়েছিল, কী ভাবে সর্বস্ব দিয়ে বাবা-মা ছেলেকে মানুষ করে। অথচ, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা বোঝা হয়ে যায়। রিল লাইফে বৃদ্ধ অমিতাভ বই লিখে অর্থ উপার্জন করতে পেরেছিলেন। রিয়েল লাইফে প্রশাসনই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ভরসা।