নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পূর্ব মেদিনীপুরের নিখোঁজ বাসিন্দাদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২২। বুধবার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্যেকের বাড়ির লোকজন বারুইপুর হাসপাতালে ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। ঘটনার পর চার দিন কেটে গিয়েছে। কেউ চাইছেন, সন্তানের ছাই ভষ্ম আনা হোক। আবার কারও স্ত্রী স্বামীর ফেরার আশায় গ্রামের শিবমন্দিরের থানে অনবরত দণ্ডি কেটে চলছেন। এই প্রতীক্ষা শেষ কোথায়, কেউ জানেন না। জেলাশাসক ইউনিস ঋষিণ ইসমাইল বলেন, পাঁশকুড়ায় বাসিন্দা আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর এসেছে। সবমিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের জেলায় ২২জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন। তমলুক ব্লকের শালিকা গড়চক গ্রামের দেবাদিত্য দিণ্ডা বাড়িতে না জানিয়ে ঘটনার চারদিন আগে নাজিরাবাদের ওই ডেকরেটর্স সংস্থার গোডাউনে বন্ধুর কাছে গিয়েছিল।
স্থানীয় টুলিয়া শীতলা মডেল হাইস্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র দেবাদিত্য। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা রামকৃষ্ণ মণ্ডল ও তার কাকা গোবিন্দ মণ্ডলও ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ। দেবাদিত্য ও রামকৃষ্ণ সমবয়সি। একে অপরের বন্ধু। রামকৃষ্ণের সঙ্গেই ওই কারখানায় রওনা দিয়েছিল দেবাদিত্য। তার বাবা শঙ্কর দিণ্ডা ও মা শর্মিষ্ঠা দিণ্ডা ঘটনার পর থেকে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন। ওই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর ছেলের বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই, এই কঠোর বাস্তবটা মেনে নিয়েছেন বাবা শঙ্করবাবু। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, অন্তত ছেলের দেহ ভস্মটা দেখতে চাই।
শঙ্করবাবু কঠোর বাস্তবটা আঁচ করলেও, পাঁশকুড়ার মাগুরী জগন্নাথচক গ্রামের ১৯ বছরের রুম্পা ফাদিকর তা মানতে পারছেন না। বরং অলৌকিক কিছু ঘটনায় স্বামী সমরেশ ফাদিকার বাড়ি ফিরে আসছেন, এই বিশ্বাসেই গ্রামের শিবমন্দিরে ভেজা কাপড়ে দণ্ডি কেটে চলেছেন রুম্পা। বাড়িতে এক বছর বয়সের শিশু সন্তান। মাত্র ছ’মাস আগে ওই ডেকরেটার্স সংস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিল সমরেশ। গত এক বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করতেন সমরেশের ভগ্নিপতি তপন দোলুই। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর শ্যালক ও ভগ্নিপতি দু’জনেই নিখোঁজ। সমরেশের বাবা তথা তপনবাবুর শ্বশুর নৃপেন ফাদিকার বলেন, বিপদ এভাবে আসতে পারে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। একদিকে, ১৯ বছরের পুত্রবধূ। আরেক দিকে ২৮ বছরের মেয়ে বর্ণালী। কাকে সান্ত্বনা দেব, নিজেই বুঝতে পারছি না। অলৌকিক কোনও ঘটনার মধ্য দিয়ে ছেলে ফিরে আসবে বলে এখনও বিশ্বাসে অটল পুত্রবধূ। গ্রামের মন্দিরে দণ্ডি কেটে চলছে। এসব দেখে আমার বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পাঁশকুড়ায় সাত জন, তমলুকে সাতজন, ময়না দু’জন, নন্দকুমারে তিনজন, সুতাহাটায় দু’জন এবং শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকে একজন নিখোঁজ আছেন। বুধবার রাতে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ নমুনা দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। তমলুক ব্লকের নিজ্জত গাড়ুপোতা গ্রামের ক্ষুদিরাম দিণ্ডা, শালিকা ধনীচক গ্রামের শশাঙ্ক জানা, শ্রীরামপুর-১ পঞ্চায়েতের গুরুপদ সাউ ও নীলকুণ্ঠা গ্রাম পঞ্চায়েতের বিমল মাইতি অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই নিখোঁজ। একটা ঘটনা একসঙ্গে ২২টা পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। জেলা প্রশাসন সবরকমভাবে এইসব পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে।