Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

পুলিশের জালে পরিবারের কেউ কেউ, বাকিরা পড়িমরি ফিরছেন বাংলাদেশে

বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে।

পুলিশের জালে পরিবারের কেউ কেউ, বাকিরা পড়িমরি ফিরছেন বাংলাদেশে
  • ২৯ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্যামলেন্দু গোস্বামী, হাকিমপুর: বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। সেইসঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধির জেরে হাকিমপুর চেকপোস্টে ধরা পড়ছে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর ঘরে ফেরার ছবি। দীর্ঘদিন এদেশে বসবাস করা একাধিক বাংলাদেশি পরিবার এখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরছেন ওপারে। কিন্তু অনেক পরিবারের উদ্বেগ আরও গভীর— কারণ, তাঁদের স্বামী, ছেলে বা আত্মীয় পুলিশের হাতে আটক। হাকিমপুর চেকপোস্টের ধারে বসেছিলেন খাদিজা বিবি। পাশে দু’টো বস্তা, একটি ট্রলি ব্যাগ। কাপড়ে বাঁধা সংসারের শেষ সম্বল। কিন্তু তাঁর চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। সকাল থেকে বহু বার ফোন করা হয়েছে। কোনও উত্তর নেই।  দুর্গানগরে বসবাস করা খাদিজার স্বামী আবু তালেব মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে দমদমের একটি গোশালায় কাজ করতেন। সঙ্গে থাকত ছেলে দিদার মণ্ডলও। বাবা-ছেলে একই কাজে যুক্ত ছিলেন। বহু বছর ধরেই তাঁরা এ দেশে ছিলেন এবং এলাকায় পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। অভিযোগ, দু’দিন আগে ইকো পার্ক থানার পুলিশ আবু তালেব ও তাঁর ছেলে দিদারকে আটক করে নিয়ে যায়। প্রথম দিকে ফোনে যোগাযোগ হলেও, বুধবার সকাল থেকে আর কোনও খবর নেই। সীমান্তে বসে খাদিজা বলছিলেন, ওরা শুধু কাজ করত। কোনও গোলমাল করত না। প্রথমে বলেছিল, জিজ্ঞাসাবাদ হচ্ছে। তারপর আর ফোন ধরছে না। এখন চারদিকে সবাই বলছে চলে যাও, তাই চলে যাচ্ছি। কিন্তু ওদের ছাড়া কী ভাবে ফিরব? 

Advertisement

একই উদ্বেগ দেখা গেল রূপা মুন্সির পরিবারেও। সীমান্তের একটু দূরে বসেছিলেন তিনি। পাশে নাতনি। চোখেমুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা। রূপার স্বামী রাকিব মুন্সি ও নাতি আলতাব মুন্সিকে বিধাননগর থানার পুলিশ আটক করেছে বলে অভিযোগ পরিবারের। রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন রাকিব ও আলতাব। একটি বহুতল আবাসনের নির্মাণকাজ চলাকালীন পুলিশ গিয়ে তাঁদের আটক করে। বুধবার সকাল পর্যন্ত ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল পরিবারের সঙ্গে। কথা বলেছিলেন রূপা। তারপর থেকেই ফোন বন্ধ। রূপা বলছিলেন, থানায় গিয়েছিলাম। অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু দেখা করতে দেয়নি। এখন শুনছি, সবাইকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ফোনে আমাদের ওরা বলেছিল, আমাদের কী হবে জানি না! তোমরা বাড়ি যাও। তাই পরিবারের চারজন চলে যাচ্ছি। ভয় লাগছে। তাই সীমান্তে চলে এসেছি।  আমাদের বাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহতে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সম্প্রতি সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরতলিতে পরিচয়পত্র যাচাই, তল্লাশি ও বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার কাজ অনেক বেশি জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি অভিযানও বেড়েছে। প্রশাসনের দাবি, বেআইনি অনুপ্রবেশ রুখতে কড়া পদক্ষেপ করা হচ্ছে। তারই প্রভাব এখন স্পষ্ট হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে। প্রতিদিনই বহু অনুপ্রবেশকারী পরিবার সীমান্তের দিকে পৌঁছচ্ছে। কেউ স্বামীকে হারিয়েছেন, কেউ ছেলেকে। কেউ জানেন না, প্রিয়জনকে কোথায় রাখা হয়েছে। তবু আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না তাঁরা। বুধবার বিকেলের দিকে সীমান্তে বিএসএফের গাড়ি ঢুকতেই চমকে ওঠেন খাদিজা বিবি। তড়িঘড়ি ফোনটা হাতে তুলে নেন। কিন্তু স্ক্রিন তখনও নিঃশব্দ। পাশে বসে থাকা রূপা মুন্সিও দূরে তাকিয়ে। তাঁদের সামনে খুলে রয়েছে বাংলাদেশ ফেরার রাস্তা। দেশে ফেরার তাগিদে এক বা দু’জন নয়, সীমান্তে অনেকেই আসছেন প্রিয়জনের ‘সঙ্গছাড়া’ অবস্থাতেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ