Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

পদ্মপাতা

পদ্মপাতা
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সোমজা দাস  

Advertisement

পিং করে শব্দ হতে উত্তেজিতভাবে মোবাইলটা অন করল মৃত্তিকা।     

‘এ নদীর জল
তোমার চোখের মতো ম্লান বেতফল;
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে 
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এই নদী তুমি।’ 

পরবর্তী কিছুক্ষণ মেসেজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ল সে। একবার, দু’বার, আরও অনেকবার, যতক্ষণ না মেসেজের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি, প্রতিটি শব্দ তার মুখস্থ হয়ে গেল।        
ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশোনা করলেও দ্বিতীয় ভাষা হওয়ার সুবাদে বাংলাটা জানে মৃত্তিকা। কখনওসখনও দু-চারটে গল্পের বইও পড়েছে। কিন্তু কবিতার সঙ্গে তার সখ্য ছিল না কোনওদিনই। মাস দুয়েক আগে প্রথমবার মেসেজ পাওয়ার পর তোজোকে মেসেজটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘দেখ, কেউ আমাকে কবিতা লিখে পাঠিয়েছে!’
তিনটে লাইন লেখা ছিল শুধু সেদিন।   
‘আকাশের আড়ালে আকাশ
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ;
তার প্রেম ঘাস হ’য়ে আসে।’
তোজোটা এমন বদমাস, সঙ্গে সঙ্গে কলেজের বন্ধুমহলে খবরটা চাউর করে দিয়েছিল। সকলে হামলে পড়েছিল মৃত্তিকার প্রেমপত্র, থুড়ি কবিতাপত্র পড়ার জন্য।
‘প্রেম ঘাস হয়ে আসে! সর্বনাশ!’ কপালে চোখ তুলে বলেছিল তোজো।    
সেঁজুতি ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ‘এটা অন্বয়ের কাজ নয় তো! একে তো হাফসোল, তার উপর কবিতা টবিতাও লেখে শুনেছি। কবিতাটা থেকেও কেমন যেন হার্টব্রেক হার্টব্রেক গন্ধ ছাড়ছে।’       
বাকিরাও সেঁজুতির সন্দেহটাকে নেহাত দুচ্ছাই করে ফেলে দিতে পারেনি। অন্বয়ের সঙ্গে মাস আড়াই চুটিয়ে প্রেম করার পর তারা আলাদা হয়েছিল তার কিছুদিন আগেই। আড়াই মাসে একটিবারের জন্যেও কোনও বিষয়ে মত মেলেনি তাদের। তবে শেষ দিনে দু’জনেই একমত ছিল যে, অন্যজনের সঙ্গে জাস্ট থাকা যায় না। 
‘দাঁড়া দেখি।’ 
সোজা গটগট করে হেঁটে অন্বয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মৃত্তিকা।     
‘এটা তুই লিখেছিস?’ বলে মোবাইলটা এগিয়ে দিয়েছিল তার দিকে।   
অন্বয় একবার চোখ বোলাল স্ক্রিনের দিকে। পরমুহূর্তে হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘মাথা খারাপ! আমি কেন লিখতে যাব?’    
‘তাহলে কে লিখেছে?’  
‘সে লিখেছে একজন।’ চোখ নাচিয়ে বলেছিল অন্বয়। ‘তবে তোর জন্য লেখেনি।’
একটু দমে গেছিল মৃত্তিকা।
‘তবে কার জন্য লিখেছে? দেখছিস না কবিতায় আমার নাম আছে?’
‘তোর মাথা আছে।’ হতাশ গলায় বলেছিল অন্বয়। ‘এটা আকাশলীনার।’ 
‘সেটা কে? তোর নতুন গার্লফ্রেন্ড?’
‘তুই জাস্ট ইনকরিজিবল। এই জন্য বারবার বলতাম একটু বইটই পড়। জীবনানন্দ দাশের কবিতা। আকাশলীনা। কিন্তু তোকে যে কবিতা পাঠায়, সেই গাধার জন্য আমার দয়া হচ্ছে!’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল অন্বয়।      
মৃত্তিকা কটমট করে তাকিয়েছিল অন্বয়ের দিকে। তারপর একটা কথাও না বলে ফিরে এসেছিল বন্ধুদের আড্ডায়। নম্বরটায় ফোন করে দেখেছিল, সুইচড অফ। প্রোফাইল পিকচার পুরো অন্ধকার। ট্রু-কলারে অবধি কোনও নাম দেখায় না।        
সেই শুরু। সেদিনের পর থেকে প্রায় রোজই সকালে একটা করে কবিতা এসে ঢোকে মৃত্তিকার ইনবক্সে। প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতে পারত না। ওদিকে মৃত্তিকার বাকি বন্ধুদেরও বাংলার দশা তারই মতো। বাধ্য হয়ে কলেজ লাইব্রেরি থেকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার বইগুলো তুলে এনে জেরক্স করে নিয়েছিল। মেসেজ এলেই পৃষ্ঠা ঘেঁটে ঘেঁটে বের করত।    
কবিতা না হয় পাওয়া গেল। কিন্তু তারপর সার্চ ইঞ্জিন ঘেঁটে তার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ খুঁজে বের করার মতো কঠিন কাজ আর হয় না। ইদানীং অন্বয় সেকেন্ড ইয়ারের ঢ্যাঙামতো মেয়েটার সঙ্গে ঘুরছে, নইলে ওর কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া যেত। তবে আজকাল মৃত্তিকা অনুভব করছে, কবিতা জিনিসটা অতটাও খারাপ নয়।    
‘তোর অত মাথা ব্যথা কীসের?’ বলেছিল অশনি।    
সেঁজুতিও পাশ থেকে বলেছিল, ‘এমন করছিল যেন জীবনে প্রথমবার প্রেমের প্রস্তাব পাচ্ছিস। তুই মাইরি কেমন একটা ন্যাকামার্কা প্রেমিকা টাইপ হাবভাব করছিস!’    
তোজো মুচকি হেসে বলেছিল, ‘আমাদের মিতুরানি মনে হচ্ছে এবার সেই অনামিকার প্রেমে পড়েছে!’
‘অনামিকা মেয়েদের বলে তোজো!’ কেটে কেটে বলেছিল মৃত্তিকা। 
‘যাহ শালা! শুধু মেয়েদের? তাহলে ছেলেদের কী বলে?’ ভেবলে যাওয়া মুখে জিজ্ঞাসা করেছিল তোজো। 
‘আমি কী জানি কী বলে!’ খেঁকিয়ে উঠেছিল মৃত্তিকা। ‘অত বাংলা জানলে অন্বয়ের সঙ্গে প্রেমটা ভাঙত নাকি? তখন সারাদিন ওর সঙ্গে বইমেলা, কলেজস্ট্রিট ঘুরতে হতো বলে ঝগড়া হতো। এত এত কবিতার বই কিনত। ব্রেক-আপের পর ভাবলাম এবার ঘাড় থেকে নামল। এখন আবার এই কবিতা। ধুর! আমার কপালেই জোটে!’   
সেদিন বলেছিল বটে, কিন্তু গত দু’মাসে মেসেজগুলো কেমন যেন নেশার মতো হয়ে গেছে। কোনওদিন কবিতা না এলে কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। দিনটা ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। কথায় কথায় ঝামটে ওঠে সেদিন মৃত্তিকা।       
এই তো যেমন গত পরশু। সারাটা দিন পেরিয়ে গেল, মেসেজ এল না। যতবার মেসেজ ঢোকার শব্দ হয়েছে, প্রতিবারই আগ্রহ নিয়ে মোবাইল খুলে দেখেছে। অন্য হাজারটা মেসেজ এসেছে, কিন্তু সেই বিশেষ একজন কোনও মেসেজ পাঠায়নি। অটোমেটা থিয়োরেমের ক্লাসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার জন্য এমকেডি-র বকা শুনেছে। স্ট্যাটস্টিকসের ক্লাসে দু-দুটো ডিরাইভেশন মাঝপথে এসে আটকে গিয়েছে মৃত্তিকার।  
সেসব তবু মানা যেত। কিন্তু যখন রাতে খেতে বসে মাংসের নলিটা পাতে ফেলে রেখে উঠে গেল সে, তখন তো মা-ও জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর শরীর ঠিক আছে তো?’  
চোয়াল শক্ত হয়েছিল মৃত্তিকার। অন্বয়ের সঙ্গে প্রেম ভাঙার পরেও দিব্যি বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তরাঁয় বিরিয়ানি, মাটন চাপ খেয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখেছে। মৃত্তিকার বয়ে গিয়েছে কারও জন্য খারাপ থাকতে।     
রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সারারাত ধরে বারবার হোয়াটস্যাপ চেক করেছে। ভোর রাতের দিকে চোখ জড়িয়ে এসেছিল। ঘুম ভাঙল পিং পিং শব্দে। চমকে উঠে বসে হোয়াটস্যাপ খুলল।   
‘তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লে
তুমি আমার পদ্মপাতা হলে;’
শিউরে উঠেছিল মৃত্তিকা। ঘড়িতে তখন সওয়া চারটে। পুবের আকাশে লালচে আভা। পায়ে পায়ে জানলার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে। নিজেকে স্পর্শ করে রোমাঞ্চিত হচ্ছিল বারবার। পদ্মপাতা! কারও প্রেমের বিন্দু তার বুকে টলটল করে। কোনও হৃদয়কে সেও আশ্রয় দেয়, দেয় শীতল মায়া। বুক কাঁপে তার। একুশ বছরের জীবনে তাকে এভাবে কেউ বলেনি। কারও জন্য কোনওদিন সে পদ্মপাতা হয়নি। নিজেকে এত ভালো আগে কোনওদিন লাগেনি তার।      
কলেজে গিয়ে ক্লাসের ছেলেদের খুঁটিয়ে দেখে মৃত্তিকা। এদের মধ্যেই কেউ কি? নাকি কোনও সিনিয়র? আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে সে আদৌ কলেজের কেউ নয়। হয়তো পাড়ার ছেলে, বা আবাসনের, কিংবা চেনা কেউ! কে হতে পারে ভাবতে বসে। ভেবেই চলে। দিন-রাত ঢেউয়ের মতো বয়ে যায় মৃত্তিকার মনের উপর দিয়ে।  
‘তোর প্রেম কদ্দূর এগল রে?’ জিজ্ঞাসা করল অশনি।  
মৃত্তিকার বলল, ‘কীসের আবার প্রেম? যাহ্‌!’
‘উরিন্না, আমাদের মিতুরানি ব্লাশ কচ্ছে রে! ওরে মিতু, তোর তো পুরো গন কেস!’ খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলল তোজো।   
সেঁজুতিও চোখ বড় বড় করে বলল, ‘লে! এ কি সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে গেল নাকি? ও মিতু, মিতু রে, প্রেমে পড়। প্রেম ভালো জিনিস। প্রেমে পড়লে মন ফুরফুরে থাকে। খিদে কম পায় বলে এক্সারসাইজ ছাড়াই দিব্যি ওয়েট লস হয়। প্রেমটা একবার জমে গেলে সিনেমা দেখা, হ্যাং-আউট করার জন্য এইসব ল্যাদাড়ু বন্ধুদের তেল মারতে হয় না। নিজের রাজত্বে বেশ একটা বশংবদ প্রজা পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব সত্যি সত্যি প্রেম হলে তখন। তোর কেসটা তো কমপ্লিকেটেড টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। একে তো কবিতা, তাও বাংলা, তার উপর সেন্ডার আননোন। ফালতু কেস খেয়ে যাবি। পরে যেন বলিস না যে সাবধান করিনি।’      
মৃত্তিকা মুচকি হাসল শুধু। উত্তর দিল না। ওরা কী বুঝবে কারও পদ্মপাতা হতে পারার কী সুখ! কিন্তু আর এভাবে চলছে না। এই গোপন প্রেমিকের পরিচয় জানাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। একটা সন্দেহ হচ্ছে, তবে নিশ্চিত হতে হবে।
ভেবেচিন্তে তোজোকে ধরল মৃত্তিকা।  
‘তোর কোন জ্যাঠতুতো না মাসতুতো দাদা আছে না এথিকাল হ্যাকার, লালবাজারে চাকরি করে! নামটা জেনে এনে দে না ভাই। মাইরি বলছি, চাপ হয়ে যাচ্ছে!’     
তোজো চোখ সরু করে বলল, ‘তার মানে আমি ঠিক ধরেছি। মিতুরানির প্রেম পেয়েছে। রাইট?’   
‘বিরিয়ানি খাওয়াব। কাজটা করে দে।’   
তোজো হিসেবি চোখে মেপে নিল মৃত্তিকাকে। তারপর বলল, ‘পরে পালটি খাবি না তো! আর শুধু বিরিয়ানিতে হবে না। মুভি দেখাবি মাল্টিপ্লেক্সে!’
‘শালা...!’ দাঁতে দাঁত ঘষে মৃত্তিকা।  
‘বেশ, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নে গে!’
‘না না’, রাগটা গিলে ফেলে মিনতি করল মৃত্তিকা। ‘শুধু নামটা জানা। তুই যা বলবি তাই হবে।’ 
‘বাই দ্য ওয়ে, তুই নাম জেনে করবিটা কী? মারধর করবি নাকি!’ 
মৃত্তিকা ফিক করে হাসল। তারপর বলল, ‘যদি উল্টোটা করি?’
‘উল্টো? সেটা কী?’   
মৃত্তিকার মুখের রেখায় রহস্য ঘনায়। বলে, ‘সেটা তোকে বলব কেন?’
তোজো চোখ গোল গোল করে বলে, ‘বাব্বা, তলে তলে এত দূর?’
‘ওসব তুই বুঝবি না। সে আমাকে পদ্মপাতা বলেছে। যা, ভাগ এবার।’
তোজো হাঁ করে মৃত্তিকার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল একবার। তারপর বলল, ‘তোর মাথাটা গেছে। আর আশা নেই।’ 
আশা যে নেই, তা কি আর মৃত্তিকা নিজে জানে না! এর মধ্যে একদিন কলেজে গিয়ে অন্বয়কে ধরে পড়ল সে। ‘অ্যাই শোন, তুই শিওর যে কবিতাগুলো তুই পাঠাচ্ছিস না?’ 
অন্বয় একটু সময় নিল ব্যাপারটা অনুধাবণ করতে। তারপর বলল, ‘একটা কবিতা তো দেখেছিলাম। আরও আছে বুঝি? তোর মতো মাথামোটাকে কবিতা যে পাঠায়, সে আরও বড় মাথামোটা।’
‘আচ্ছা, তার মানে তুই নোস’, বেজার মুখে বলল মৃত্তিকা। ‘তোর চান্সটা গেল।’  
‘কীসের চান্স?’ 
‘ভেবেছিলাম, যে কবিতা পাঠাচ্ছে, তাকে খুঁজে পেলে চুমু খাব। তা তোর আর চান্স নেই, সেটাই বলছি!’
অন্বয় হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘চুমু খাবি!’  
মৃত্তিকা ভারী খুশি হয়ে বলল, ‘তা খাব না?’ 
‘হুম! গাছে না উঠেই এক কাঁদি? আড়াই মাসের রিলেশনে আমাকে তো খাসনি?’
‘তুই কি আমাকে পদ্মপাতা বলেছিলি?’   
‘পদ্মপাতা!’ অন্বয় যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে। 
দুপুরের মধ্যে সারা ক্লাস জেনে গেল ব্যাপারটা। সেঁজুতি জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই অন্বয়কে কী বলেছিস?’
‘কেন অন্বয় তোকে বলেনি?’ 
‘তুই পাগল। একটা আস্ত পাগল মৃত্তিকা।’
‘আমি তার প্রেমে পাগল। একবার যদি তাকে পাই...’
‘তা বলে...!’ রাগ রাগ গলায় বলল সেঁজুতি।
‘সে তো খেতেই হবে। এর মধ্যে বেশ একটা নান্দনিক ব্যাপার আছে। বল?’
মাইক্রোপ্রোসেসর ল্যাব চলাকালীন এল মেসেজটা।  
‘কার্তিকের ভোরবেলা দূরে যেতে যেতে
থেমে গেছে সে আমার তরে।
চোখ দুটো ফের ঘুমে ভরে
যেন তার চুমো খেয়ে!’
মুচকি হাসল মৃত্তিকা। স্যারের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে বেরিয়ে ছুটল কলেজ লাইব্রেরির দিকে। শিকার ফাঁদে পা দিয়েছে। গত সপ্তাহেই লাইব্রেরির জাবদা খাতাটা চেক করেছিল সে সুযোগ পেয়ে। গত দু-মাসে সে ছাড়া একজনই জীবনানন্দের কবিতার বই তুলেছিল বেশ কয়েকটা। আজও সে-ই ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ তুলেছে থার্ড পিরিয়ডে।    
ল্যাবে ফেরার পথে মেসেজটা করল। মৃত্তিকার ঠোঁটের কুলে কুলে হাসির উত্তাল ঢেউ। 
ঠিক বিকেল ছ’টার সময় লেকের ধারে দাঁড়িয়েছিল মৃত্তিকা।    
‘ডেকেছিলি কেন?’  
পেছনের কণ্ঠস্বর শুনে ঘুরে তাকাল সে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল সামনের ব্যক্তির মুখের দিকে। তারপর ছদ্ম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল, ‘কী ভেবেছিলি? আমি ধরতে পারব না?’ 
এবার ঝঙ্কার দিয়ে উঠল তোজো।
‘কী করব? না বললে বুঝতে পারিস তুই? ক্যাবলা-কার্তিক অন্বয়টার সঙ্গে ঝুলে পড়লি শুধু ও কবিতা লেখে বলে! তাই...।’  
‘তাই আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য কবিতা লিখে পাঠাতে শুরু করলি? তাও জীবনানন্দের থেকে টুকে?’ ঠান্ডা গলায় বলল মৃত্তিকা।    
তোজো মাথা নিচু করে রইল। তারপর বলল, ‘টুকে নয়। যে আমি জীবনে কোনওদিন বাংলায় পঞ্চাশের বেশি পাইনি, তোর জন্য এ ক’দিনে জীবনানন্দের সব বই পড়তে হয়েছে। দিদিকে ঘুষ দিয়ে মানে বুঝতে হয়েছে।’   
খিলখিল করে হেসে উঠল মৃত্তিকা। তারপর কাছে ঘনিয়ে এসে তোজোর টি-শার্টের কলারটা ঠিক করে দিল। ওর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘তাহলে এবার?’
‘কী এবার?’ 
তোজো আর মৃত্তিকা একদম কাছাকাছি। চোখে চোখ রেখে একটুক্ষণ চেয়ে থাকল মৃত্তিকা। তোজোটা যে এত সুন্দর, কই আগে তো কোনওদিন চোখে পড়েনি। ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে মৃদুস্বরে বলল মৃত্তিকা, 
‘এ দেহ অলস মেয়ে
পুরুষের সোহাগে অবশ!
চুমে নেয় রৌদ্রের রস
হেমন্ত বৈকালে...’
লেকের জলে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মৃত্তিকা আজ পদ্মপাতা হয়েছে।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ