সুখেন্দু পাল, কাটোয়া: কথা বলেন মেপে। বাড়তি কিছু বলতে পছন্দ করেন না। অনাড়ম্বর জীবন-যাপন। তাঁর ব্যবহারে মুগ্ধ দলের কর্মীরা। সব সময় মাথা ঠাণ্ডা। যুদ্ধ যতই কঠিন হোক, তিনি একেবার কুল। মেজাজ হারিয়ে ফেলেননি কোনোদিন। তাঁকে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত কাটোয়াবাসী। রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সবার কাছে তিনি ‘রবি দা’। সংসদীয় রাজনীতির লড়াইয়ে ডাবল হ্যাট্রিক করার পরও তাঁর উপরই ভরসা রেখেছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কথা কম বললেও মনটা দরাজ রবিদার। অফিসের দরজাও সর্বক্ষণ খোলা। জনসংযোগের ক্ষেত্রে ‘যখন ডাকি, তখন পাই’ গোছের ভাবমূর্তি। ফলে, ভোটের সময় প্রথাগত প্রচার ছাড়া বাড়তি তেমন কিছু কর্মসূচি থাকে না তাঁর।
স্বভাবতই ভোটের তাপ-উত্তাপ খুব একটা স্পর্শ করে না রবিদাকে। ৩০ বছরের বিধায়ক জীবনে একবারই তাঁর স্নায়ুর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল সিপিএম। প্রচারের ফাঁকে সেই স্মৃতিচারণ করছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বলছিলেন, ‘২০০৬ সালের বিধানসভা ভোট। সিপিএম সেবার দারুণ এক কৌশল নিয়েছিল। ভোটের কিছুদিন আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিলান্যাস করে ফেলে। বাড়িতে বাড়িতে ফরম বিলি করে চাকরির আশ্বাস দেয়। কাটোয়াবাসী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আমিও বেশ চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু, মানুষ শেষ পর্যন্ত আমার উপরই ভরসা রাখেন।’
আদি কংগ্রেস ঘরানার মানুষ রবীন্দ্রনাথ। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু। জনপ্রতিনিধি হিসাবে রবি দা’র কাজ শুরু ১৯৯৫ সালে। তখন তিনি কংগ্রেসের ডাকাবুকো নেতা। অপ্রতিরোধ্য বামেদের যে হারানো যায়, সেটা দেখিয়েছিলেন রাজ্যবাসীকে। তাঁর নেতৃত্বে পুরসভা দখল করে কংগ্রেস। হয়েছিলেন চেয়ারম্যান। পরের বার বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করে বিধায়ক। সেই শুরু। তারপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। টানা ছ’বারের বিধায়ক। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে গেরুয়া ঝড় ভাগরথীর পাড়েও উঠেছিল। কিন্তু সেবারও ৪৮.০৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জয়ী হন।
শহরের বাসিন্দারাও বলছেন, ‘রবি’দার ইউএসপি বিধানসভা কেন্দ্রের বহু মানুষকেই তিনি নামে চেনেন।’ দলেরই এক নেতা বলছিলেন, ‘ওঁর মধ্যে এক অদ্ভুদ জাদু রয়েছে। এতদিন বিধায়ক পদে রয়েছেন। সমালোচনা থাকবেই। দলের বহু নেতার আচারণ, হাবভাব অনেকেরই পছন্দ নন। কিন্তু রবি’দা কারও সামনে দাঁড়ালে সেই ক্ষোভ উধাও হয়ে এটাই ওঁর ব্যক্তি ক্যারিশমা।’
পানুহাটে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘শহরের মানুষের বিভিন্ন কারণে ক্ষোভ রয়েছে। রবিদা টিকিট না পেলে এবার কি হতো কে জানে। কিন্তু, তাঁকে এলাকার মানুষ অন্যভাবে দেখেন।’ বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণ ঘোষ বলেন, ‘শ্রীখণ্ডে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আজও হল না। প্রতিবার ভোটের আগে তৃণমূল প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবায়িত করে না। তৃণমূলের জমানায় শহরে একাধিক অনিয়ম হয়েছে।’ বাসিন্দারাও বলছেন, নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত হওয়া দরকার ছিল। দাঁইহাটে পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। কাটোয়ায় উড়ালপুল না হওয়ার যন্ত্রণা রয়েছে। এসব দাবিকে অগ্রাহ্য না করেও তৃণমূল বলছে, ‘সমস্যা রয়েছে ঠিকই, তবে কাজও কম কিছু হয়নি।’
অর্থাৎ, কাটোয়াজুড়ে উন্নয়ন হয়েছে। তারপরও এসআইআর খানিক চাপে রাখছে তৃণমূলকে। বড় ফ্যাক্টর হয়ে গিয়েছে ‘ডি ভোটার’। বহু বৈধ ভোটার এবার ভোট দিতে পারবেন না। রবিবাবু প্রচারে বেরিয়ে বলছেন, ‘এটা বিজেপি-কমিশনের কারসাজি।’ কথায় ভরসা রাখছেন কাটোয়াবাসী। এখন দেখার রবির কিরণ কতখানি তেজি প্রভাব ফেলে ইভিএমে।