রামকুমার আচার্য, আরামবাগ: এ যেন দেশের মধ্যে আর এক দেশ! এক দেশ গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল। অন্য দেশে ‘গণতন্ত্রকে নির্মম হত্যা’র অভিযোগ। আর এই ‘অন্য দেশ’-এ বেঁচেবর্তে থেকে কি লাভ? ভারতের নির্বাচন কমিশনকে এমনই এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করলেন আরামবাগ মহকুমার দুই বোন সহ প্রায় ছ’জন ডিলিটেড ভোটার। তাঁদের এই নজিরবিহীন কঠোর সিদ্ধান্তে তোলপাড় এখন বঙ্গ-ভোটের রাজনীতি। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনকারী ছ’জনের সঙ্গে নাড়ির যোগ থাকা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভোটাধিকার অক্ষত।
সোমবার আরামবাগ মহকুমা শাসকের কার্যালয়ে আচমকা হাজির হন ওই ছ’জন ডিলিটেড ভোটার। গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে হতাশায় ভুগছিলেন। পরিবারের অন্যান্য সবাই এবার ভোট দিতে পারবেন। অথচ, তাঁরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন না। ট্রাইবুনালে আবেদন করলেও ভোট-ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এরপর এনআরসি হলে পরিবার ছাড়তে হবে। যেতে হতে পারে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এরকম নানা অশনি সংকেত মনের মধ্যে ভিড় করছিল। শেষ পর্যন্ত জোট বেঁধে মহকুমা শাসকের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেন সকলেই। এসডিওর মাধ্যমে তাঁদের এই আবেদন পাঠাতে চান দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে।
এদিন ওই ডিলিটেড ভোটাররা নিজেদের নানা সরকারি পরিচয়পত্র সঙ্গে করে এসডিও অফিসে আসেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরামবাগ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার স্বপন নন্দী। তিনি বলছিলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে প্রায় ২০৬ জন ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে কমিশন। মোদি সরকারকে বিশ্বাস নেই। ওরা এনআরসি চালু করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে। সবার মধ্যেই উৎকণ্ঠা। রাতের ঘুমটাও উবে গিয়েছে। এভাবে বেঁচে থাকা কিংবা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার চেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুই শ্রেয়। তাই অনুমতি পেতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন বাতিল ভোটাররা। বিজেপি চক্রান্ত করে নিরপরাধ বৈধ ভোটারদের নির্যাতন করছে।’ বিজেপির আরামবাগ সংগঠনিক জেলা সভাপতি সুশান্ত বেরা বলেন, ‘তৃণমূল স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করেছে। এটি সংকীর্ণ রাজনীতি। কারো নাম বাদ গেলে তিনি ট্রাইবুনালে আবেদন করবেন। নির্দিষ্ট নিয়মে নাম উঠবে। এখানে বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই।’
প্রশাসন সূত্রে খবর, এদিন স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেছেন গোঘাটের ভগবতী বালিকা বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তৈয়েবুন্নেসা বেগম। তিনি ওই স্কুলেই ১৮ বছর ধরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। থাকেন আরামবাগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। রয়েছে পাসপোর্টও। তারপরও তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন শিক্ষিকার দাবি, ২০২৩ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। যথারীতি পেনশনও পাচ্ছেন। ২০২৪ সালে সরকারি অনুমোদন নিয়ে হজ করতেও গিয়েছিলেন। তারপরও এসআইআরে তাঁর নাম ডিলিটেড হয়েছে।
এদিন এসডিও অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে তৈয়েবুন্নেসা বেগমের আক্ষেপ, ‘২০০২ সালের তালিকায় আমার নাম রয়েছে। স্বামী ও মেয়ের নাম এবারের তালিকায় উঠেছে। আমার নামের সঙ্গে লিংক করে মেয়ের নাম তালিকায় উঠল। অথচ, আমাকে বাদ দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় সরকারই তো বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। এমনকি, পাসপোর্টও রয়েছে আমার। তারপরও কীভাবে কমিশন নাম বাদ দিল, তা বুঝে উঠতে পারছি না। এমন দেশে বেঁচে থেকে আর কি করব! তাই স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেছি প্রশাসনের কাছে।’ আর এক আবেদনকারী জাকির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, ‘২০০২ সালে ভোট দিয়েছিলাম। দুই ছেলে সহ পরিবারের সবার নাম উঠেছে। আমার নামটাই নেই। একই দেশ, একই পরিবারে বাস করেও বিচ্ছিন্ন থাকার চেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু করাই শ্রেয়। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন দয়া করে আমাদের আবেদন মঞ্জুর করুন।’ নিজস্ব চিত্র