Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুরুতর প্রশ্নের মুখে ‘স্যার’-এর বিশ্বাসযোগ্যতা

গত সপ্তাহের শেষে, বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চ্যালেঞ্জের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে—ডিলিশন লিস্ট বা খারিজের তালিকা কারণসমেত প্রকাশ করা এবং দাবির প্রেক্ষিতে আধারকে গ্রহণ করা। এই শুনানি অবশ্য চলবে।

গুরুতর প্রশ্নের মুখে ‘স্যার’-এর বিশ্বাসযোগ্যতা
  • ১৮ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: গত সপ্তাহের শেষে, বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চ্যালেঞ্জের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে—ডিলিশন লিস্ট বা খারিজের তালিকা কারণসমেত প্রকাশ করা এবং দাবির প্রেক্ষিতে আধারকে গ্রহণ করা। এই শুনানি অবশ্য চলবে।

Advertisement

অস্বাভাবিক সংখ্যা
তবে, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতার বাইরে পড়ে এসআইআরের এমনকিছু দিক রয়েছে। এসআইআরের কিছু বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে, যা আগে কখনও ছিল না এবং সেগুলি উদ্বেগজনকও। প্রথমত, খটকা এর ‘নাম’ নিয়ে। : পূর্ববর্তী সংশোধনগুলিকে ‘স্পেশাল’ অথবা ‘সামারি’ রিভিশন—বাংলা তর্জমায় ‘বিশেষ’ বা ‘সংক্ষিপ্ত’ সংশোধন বলা হতো। দ্বিতীয় খটকা এসআইআরের ‘সময়’ নিয়ে। লোকসভা বা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের চারমাসের মধ্যে আগে কখনও এই ধরনের পদক্ষেপ করা হয়নি। তৃতীয় খটকা ‘সময়সূচি’তে। ‘সংশোধন’-এর জন্য মাত্র ৩০ দিন নির্ধারিত হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত ‘আপত্তি এবং দাবি’ নিষ্পত্তির জন্য দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত ৩০ দিন মাত্র। খটকা নম্বর চার হল ‘সুযোগ’। আগেকার সংশোধনীগুলির ক্ষেত্রে ঠিক পূর্ববর্তী ভোটার তালিকাগুলিকেই বেসলাইন ডেটা বা তথ্যের ভিত্তি মানা হয়েছিল। নতুন নাম সংযোজন বা ‘অন্তর্ভুক্তি’ এবং বাতিলযোগ্য নাম কেটে দেওয়া বা ‘বর্জন’ করা হয়েছিল সেই অনুসারেই। এবারের এসআইআরের জন্য কী করা হল? বিহারে ২০২৪ সালের ভোটার তালিকা ‘স্ক্র্যাপড’ গণ্য হল বা গৃহীতই হল না। অভিযোগ যে সেখানে ‘নতুন’ ভোটার তালিকা তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হল। (সূত্র: প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার, অশোক লাভাসা)। এবারের পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হল—নাম বাদ দেওয়ার উপর অদ্ভুত জোর দেওয়া হয়েছে এবং অন্তর্ভুক্তির উপর যে নীরবতা তা ইচ্ছাকৃত। অবশেষে বলব যে, এই চর্চা থেকে যে বিপুল সংখ্যার হিসেব দেখা যাচ্ছে তা এইরকম: ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ ভোটারের মধ্যে কমিশন (ইসিআই) রায় দিয়েছে যে—২২ লক্ষ ব্যক্তি ‘মৃত’, ৭ লক্ষ ব্যক্তির নাম ‘একাধিক জায়গার ভোটার তালিকায় রয়েছে’ এবং ৩৬ লক্ষ ব্যক্তি ‘স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন কিংবা তাঁদের হদিশ মেলেনি’।
কেউ জানে না
মৃত্যু এবং জন্ম স্বাভাবিক ব্যাপার। মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতেই হবে, কারণ সেটা সঠিক পদক্ষেপ। তবে একইসঙ্গে এটাও যথার্থ পদক্ষেপ নয় কি—যেসব তরুণ-তরুণীর নির্দিষ্ট একটি তারিখে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হল তাদের নামগুলিও নতুন ভোটার তালিকায় তুলতে হবে? বিহারের জীবিত শিশুদের জন্মহার বিবেচনা করলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে ১৮ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা অবশ্যই কয়েক লক্ষ হবে। তাদের নাম কি এবারের তালিকায় তোলা হয়েছে? নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি, এবং ব্যাপারটা কেউ জানেও না।
নির্বাচন কমিশন কীভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে ৩৬ লক্ষ ব্যক্তি ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ হয়েছেন অথবা ‘তাঁদের সন্ধান পাওয়া যায়নি’? ইসিআই কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার সমীক্ষা করেছিল? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি স্বীকার করেছেন যে তাঁরা স্থায়ীভাবে বিহারের বাইরে কোনও জায়গায় চলে গিয়েছেন? নির্বাচন কমিশন কি ৩৬ লক্ষ ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে তদন্ত করেছিল? ‘অর্ডিনারিলি রেসিডেন্ট’ কারা—বিচার বিভাগ তার বৈশিষ্ট্য ও ব্যাখ্যা দিয়ে রেখেছে। নির্বাচন কমিশন সেই মানদণ্ড কখন ও কেন বাতিল করল এবং সেই জায়গায় গ্রহণ করল ‘পার্মানেন্টলি রিলোকেটেড’ বা ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’র মতো বহু অর্থবোধক একটি টার্মকে? কেউ জানে না।
এসআইআরের বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা, সহায়ক প্রমাণ (সাপোর্টিং এভিডেন্স) এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের খামতি রয়েছে। কোনও আগাম অনুমান (প্রিয়োরাই অ্যাসাম্পশন) থেকেই এই এসআইআর এবং সেই অনুমানগুলিকেই ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এই কিছু পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যে-দেশে জনসংখ্যা বার্ষিক ০.৮৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে ভোটার তালিকার যেকোনও সংশোধনের ফলে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধিই পাবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিহারের এসআইআরে উলটপুরাণ লক্ষণীয়। বহু মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করাই এই এসআইআরের নেপথ্যের মতলব বলে মনে হচ্ছে। এসআইআর বিহারের মানুষের মনে এই ভয় ধরিয়েছে যে, আগামী অক্টোবরে তাঁদের হাজার হাজার নাগিরক ন্যায্য ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। বিহারের ফলাফল দেখে যদি এসআইআর অন্যান্য রাজ্যেও করা হয়, তাহলে সবচেয়ে সম্ভাবনা এটাই হতে চলেছে যে কোটি কোটি নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।
কর্ণাটক চ্যালেঞ্জ
কর্ণাটক থেকে আর একটি চমকপ্রদ খবর বেরিয়ে এসেছে। কর্ণাটকের ২৮টি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি হল বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল। এটি আটটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গঠিত। বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল আসনে লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখে নেওয়া যাক। আপাতত মহাদেবপুরা নামক একটি বিধানসভা কেন্দ্রকে বাদ রাখা হল। কংগ্রেস প্রার্থী চারটি বিধানসভা আসনে এবং বিজেপি প্রার্থী তিনটি বিধানসভা আসনে এগিয়ে। এই সাতটি আসনে সার্বিকভাবে লিড ছিল কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষে এবং সেই সংখ্যাটি ৮২,১৭৮। এবার মহাদেবপুরায় প্রবেশ করা যাক। শুধু এই একটিমাত্র বিধানসভা আসনে বিজেপি প্রার্থী ১,১৪,০৪৬ ভোটে এগিয়ে গেলেন! তার ফলে কী হল? কংগ্রেস প্রার্থীর ৮২,১৭৮ ভোটের মোট লিড খারিজ হয়ে গেল এবং বিজেপি প্রার্থী ‘জয়লাভ’ করলেন ৩১,৮৬৮ ভোটে! এর সঙ্গে পোস্টাল ব্যালট যোগ করে বিজেপি প্রার্থীকে ৩২,৭০৭ ভোটে ‘নির্বাচিত’ ঘোষণা করা হল। এই ঘটনা নিজেই চূড়ান্ত ফলাফলকে সন্দেহজনক করে তোলে না। তবে, কংগ্রেস প্রার্থী এবং তাঁর দল যেসব ভয়ঙ্কর প্রাথমিক প্রমাণ জোগাড় করেছেন ৩২,৭০৭ ভোটের ব্যবধানটি তারই সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁরা অধ্যবসায়ের সঙ্গে ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছেন। খুঁজে বের করেছেন বহু গুরুতর ত্রুটি। যেমন—একই বাড়িতে ভোটারের অস্বাভাবিক সংখ্যা বেশি। বহু ভোটার কার্ডে বাবার নামের জায়গায় ‘xtkaprbsu’-এর মতো ননসেন্স শব্দ লেখা ছিল। অনেক ভোটার কার্ডে বয়সের জায়গায় লেখা ছিল ‘০’ কিংবা ‘১২৪’-এর মতো অদ্ভুত কিছু সংখ্যা! সেখানে এই ধরনের হাজার হাজার প্রাথমিক ত্রুটি নজরে এসেছে।
প্রশ্ন হল, যদি এই ধরনের একগুচ্ছ ‘প্রাথমিক প্রমাণ’ জোগাড় হয়ে থাকে, তাহলে কি তদন্তের প্রয়োজন হয় না? একজন সাধারণ ব্যক্তি বলবেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই’, কিন্তু ইসিআই আর কোনও সাধারণ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করে না। সংস্থাটি নিজেকে স্বাধীন বলে অহংকার করে এবং ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলি, যাঁরা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রাথমিক অংশীদার, তাঁদের কাছে জবাবদিহি করতে ইসিআই বাধ্য নয়। ‘স্বাধীনতা’র দাপটে এবং সংসদের দুই কক্ষে আলোচনার অনুমতি দিতে দুই প্রিসাইডিং অফিসারের অনিচ্ছায় উৎসাহিত হয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেকে ‘আদালত’ বলে ভান করে এবং দাবি করে বসে হলফনামা ও শপথ!
মহাদেবপুরা বিধানসভা আসনের ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে, এমন একটি ইস্যু হট্টগোলের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। আরও অনুচিত বিতর্কটিকে অপ্রাসঙ্গিক দেগে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। 
আমি আবারও বলছি, মূল বিষয় হল ‘ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা’—তা মহাদেবপুরা বিধানসভা আসনে হোক কিংবা বিহার রাজ্যে। জবাব দেওয়ার অনেক কিছুই আছে নির্বাচন কমিশনের। সেটা আজ না-হলেও ভবিষ্যতে বিচারের দিনে অবশ্যই তাকে তা দিতে হবে। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ