Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এসআইআর আসছে, কাগজ গুছিয়ে নিন

এসআইআর আসছে, কাগজ গুছিয়ে নিন
  • ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: কেউ দিচ্ছেন ১০০ টাকা। কেউ ২০০। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য ১০ টাকার বেশি নেওয়ার কথাই নয়! তারপরও মানুষ দিচ্ছে। রসিদে লেখা থাকছে জন্ম শংসাপত্রের জন্য ১০ টাকা, ১৯০ টাকা ডোনেশন। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে, বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, হাতাহাতি করছে... তাও দিচ্ছে টাকাটা। বাধ্য হচ্ছে দিতে। কারণ? আতঙ্ক। এসআইআর আতঙ্ক। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়দানের পর গোটা দেশে শুরু হয়ে যাবে ভোটার তালিকার এই ইন্টেনসিভ রিভিশন। বিহার পথপ্রদর্শক। আর সেটাই হাড় কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঘরে ঘরে খোঁজ পড়েছে ‘শংসাপত্রে’র। সব ঠিক আছে তো? আধার-ভোটার খুঁজে লাভ নেই। ওসব তো নির্বাচন কমিশন বৈধ বলেই মানছে না। সেক্ষেত্রে এমন ‘ডকুমেন্ট’ চাই, যা সবার ঘরে থাকবেই। আর না থাকলেও পুরসভা বা পঞ্চায়েতে গিয়ে ব্যবস্থা করে নেওয়া যাবে। কী সেই শংসাপত্র? বার্থ সার্টিফিকেট। তাই লাইন পড়েছে জেলায় জেলায়। বিডিও অফিসে। পঞ্চায়েতে। পুরসভায়। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেও তাদের অসুবিধা নেই। কিন্তু দিনের দেশে একমুঠো স্বস্তি নিয়ে যেন বাড়ি যাওয়া যায়। তালিকা হাতে নিয়ে যখন বাবুরা তাদের বাড়ি বাড়ি হানা দেবে, ওই বার্থ সার্টিফিকেট বুক ফুলিয়ে যেন তারা দেখাতে পারে। বলতে পারে, এই দেখুন আমি ভারতীয়। বাংলাদেশি নই। হতে পারে আমার পূর্বপুরুষ দেশভাগের যন্ত্রণা কাঁধে নিয়ে এপার বাংলায় এসেছিল। হতে পারে, রাতারাতি দেশটাকে দু’টুকরো হয়ে যেতে দেখেছিল। কয়েক ঘণ্টার দাঙ্গায়, পরিচিত মানুষগুলোকে অপরিচিত হয়ে যাওয়ায়, আর সর্বস্ব ছেড়ে আসায়... কিন্তু এ তো মনে প্রাণে তাদেরই দেশ। তারপরও বারবার তাদের প্রমাণ দিতে হবে বিশ্বস্ততার, নাগরিকত্বের! তাই মূলত মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ার সীমান্ত অঞ্চলের মানুষরা ছুটছে ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য। ঢেউ আছড়ে পড়ছে সরকারি দপ্তরে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ছে অন্য জেলাতেও। পরিচয় হারানোর, ভিটে হারানোর, দেশ হারানোর জ্বালা যে এমনই তীব্র...। ১৯৮৭ সালের আগে যাদের জন্ম, তাদের জন্য ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই হবে। তখন বিএলও’রা ফর্মে সই করিয়ে ২৩ বছর আগের ওই ইলেক্টোরাল রোল অ্যাটাচ করে দেবেন। সঙ্গে সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে অন্য নথি চাইতে পারেন। কিন্তু না দিতে পারলেও খুব ক্ষতি হবে না বলেই কমিশনের দাবি। কিন্তু যারা জন্মেছে ১৯৮৭ সালের পর? যাদের বাবা-মা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সব হারিয়ে এপারে আশ্রয় নিয়েছিলেন? অল্পেতে যে তারা সন্তুষ্ট করতে পারবে না ভোট আধিকারিকদের। ১৯৮৭ বা তার পর জন্মালে বাবা বা মায়ের শংসাপত্র যে লাগবে! তাতেই যে ঘুম উড়েছে একটা গোটা প্রজন্মের। বছরের পর বছর লাগাতার ভোট দিয়ে আসার পর তাহলে কি এক মুহূর্তে পরবাসী হয়ে যেতে হবে? যারা কয়েক পুরুষ ধরে এদেশেই আছে, তাদেরও দিতে হবে প্রমাণ। নাগরিকত্বের। ওই ১১টি নথির কোনওটি যদি তাদের কাছে না থাকে, তাহলে তাদেরও পরিণতি হবে একই। ভোটাধিকার হারাবে তারা। হয়তো তারপর নাগরিকত্বও। ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আশঙ্কার সুর... এসআইআর হল এনআরসিরই প্রথম ধাপ। প্রথমে ইন্টেনসিভ রিভিশন, তারপর ভোট, সঙ্গে চলবে এনপিআর। একবার সেন্সাস শেষ হলেই ওই তথ্য ধরে ধরে ভারতবাসীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হবে নাগরিকত্বের। তাই ভয় থাকাটা স্বাভাবিক। ভীষণভাবে স্বাভাবিক বাড়তে থাকা লাইনও। 

Advertisement

মোট ১১টি ডকুমেন্টের তালিকা বিহারে দিয়েছে কমিশন। কী আছে তাতে? ১) বার্থ সার্টিফিকেট, ২) ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বা স্থায়ী বসবাসের শংসাপত্র (পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট), ৩) তফসিলি জাতি বা উপজাতি, ওবিসি শংসাপত্র, ৪) বনাধিকার শংসাপত্র, ৫) নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি), ৬) ফ্যামিলি রেজিস্টার, ৭) পেনশন পেমেন্ট অর্ডার বা সেই সংক্রান্ত সরকারি পরিচয়পত্র, ৮) পাসপোর্ট, ৯) বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় পাশের সার্টিফিকেট, ১০) জমি বাড়ির সরকারি দলিল, ১১) ১৯৮৭ সালের আগে সরকার, ব্যাঙ্ক, স্থানীয় প্রশাসন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ইস্যু করা পরিচয়পত্র। নজর করার মতো বিষয় হল, এইসব নথির বেশ কয়েকটিতে কিন্তু জন্ম তারিখের উল্লেখই নেই। সেগুলি হল, এসসি-এসটি বা ওবিসি শংসাপত্র, ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বা স্থায়ী বসবাসের শংসাপত্র এবং বনাধিকার সংক্রান্ত সার্টিফিকেট। এনআরসি ও ফ্যামিলি রেজিস্টার বাংলার জন্য প্রযোজ্য হবে না। সেটা শুধু অসমের। অর্থাৎ বাংলায় এসআইআর শুরু হলে পাঁচটি নথিই জন্মের তারিখ প্রমাণে ব্যর্থ হবে। এর মধ্যে কোনও একটি জমা দিলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে না। তার সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে আরও কিছু দিতে হবে। আধার, ভোটার বা প্যান কার্ডে জন্ম তারিখ থাকলেও এখনও পর্যন্ত তা গ্রাহ্য নয় (যদি না সুপ্রিম কোর্ট এর মাঝে কোনও নির্দেশ দেয়)। সেক্ষেত্রে কী দিতে হবে? পেনশন সার্টিফিকেট বা ১৯৮৭ সালের আগে ইস্যু হওয়া সরকারি পরিচয়পত্র? যাঁরা সরকারি কর্মী ছিলেন না বা যাঁদের বাবা-মা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে এসেছেন, তাঁরা কী দেবেন? গোটা দেশের জনসংখ্যার মাত্র সাড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ নাগরিকের পাসপোর্ট আছে। বাকিরা তাহলে কী করবেন? অর্থাৎ, বার্থ সার্টিফিকেট ছাড়া কিন্তু গতি নেই। ঠিক এই কারণে পঞ্চায়েত, পুরসভায় লাইন বাড়ছে। আরও বাড়বে। ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেট ইস্যু হয়ে গেলে তা দেশের যে কোনও অঞ্চল থেকে অ্যাকসেস করা সম্ভব। আধিকারিকও শুধু কিউআর কোড স্ক্যান করে বা নম্বর চাপিয়ে দেখে নিতে পারবেন, পোর্টালে সেটি নথিভুক্ত আছে কি না। অর্থাৎ, তখন সেটি বৈধ বলে মান্যতা পাবে। সেক্ষেত্রে ১১টির মধ্যে একমাত্র বার্থ সার্টিফিকেটই মুশকিল আসান হতে পারে। নবজাতকদের সাধারণ শংসাপত্র, আর বেশি বয়স্কদের ‘ডিলেইড সার্টিফিকেট’। পরিস্থিতি এখন আমাদের এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, এই সবই বুঝতে হবে। সবাইকে। সাধারণ মানুষ বলতেই পারেন, আমরা নথির প্যাঁচ পয়জার বুঝি না। কিন্তু কেউ শুনবে না সে কথা। কেউ ভাববে না ওই অসহায় মুখগুলোর কথা। তখন শুধু চলবে ভোটের হিসেব। শাসকের সঙ্গে বিরোধীর চাপা লড়াই। কোন আসনে কত ভোটার কেটে গেলে তা অন্যদিকে ঝুঁকবে। বিএলও’দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, তারা বাড়ি বাড়ি না গিয়েই ফর্ম জমা করে দিয়েছেন। লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যাবে। কারা তারা? নাঃ, কোনও প্রভাবশালী নয়। আপনার-আমার মতো আম আদমি। তারা রাজনীতি বোঝে না। শাসক বোঝে না। বিরোধীও না। তারা শুধু বোঝে সংসারটুক। পেটের ভাতটুকু। আর বোঝে একটাই কথা... বাঁচতে হবে। 
এনআরসি আতঙ্ক মানবজমিনের কানাগলি দিয়ে আমাদের মনে ঢুকে পড়েছে। পড়শি রাজ্য অসমের স্মৃতি এখনও দগদগে হয়ে ঘুরছে বাংলার নানা জেলায়। উত্তমকুমার ব্রজবাসী, বিনামা বর্মন, মরিনা বিবি... এনআরসির নোটিস প্রাপ্তির তালিকা বাড়ছে। আর তাঁরা কেউ কিন্তু অসমের পাকাপাকি বাসিন্দা নন। প্রত্যেকেই বাংলার। তা সত্ত্বেও তাঁরা নোটিস পাচ্ছেন। রবিবার ছ’বছর পূর্ণ করেছে অসমের এনআরসি কর্মকাণ্ড। আজও চূড়ান্ত সুরাহা মেলেনি। শুধু নোটিস মিলছে। তার জবাব দিতে হবে। আর সেই জবাব পছন্দ না হলে? ডিটেনশন ক্যাম্প? পুশব্যাক? তারপর কী? বাংলাদেশের জেলে শেষ জীবন কাটানো? এই ভবিষ্যৎ আমরা চাই না। তাই বার্থ সার্টিফিকেট এবং আরও কোনও একটা সাপোর্টিং ডকুমেন্ট গুছিয়ে রাখতেই হবে... ওই ১১টির তালিকা মেনে। সঙ্গে যদি ২০০২-০৩ সালের ভোটার তালিকায় নিজের নাম আবিষ্কার করে রাখতে পারেন, তাহলে আরও একটু নিশ্চিন্ত। সেই তালিকা অবশ্য এরই মধ্যে আপলোড করে দিয়েছে কমিশন। ওই বছর আপনি কোথায় থাকতেন, কোন বুথ ছিল আপনার, এটুকু জানলে তালিকায় নাম খুঁজে নিতে পারবেন। তবে এমন হতেই পারে, তালিকায় নাম পেলেন কিন্তু সেখানে এমন বানান ভুল যে, সেই মানুষটিকে আপনি বলে চেনা ভার। ভাবতে পারেন, ইলেক্টোরাল রোলের পাশে তো এপিক নম্বর দেওয়া আছে। সেটা দেখেই চিনে নেবে! মুশকিল হল, সব নামের পাশে কিন্তু সেটাও লেখা নেই। তাহলে কী হবে, সেটা নির্বাচন কমিশন বলেনি। সবচেয়ে বড় কথা, কারও নাম যদি ওই তালিকায় না থাকে? তিনি যদি ওই বছরের আগে ভোট না দিয়ে থাকেন? ১৯৮৭ সালের আগে জন্ম, কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম উঠেছে ২০০৪ সালে... তখন কী? সেই উত্তরও কিন্তু কমিশন দেয়নি। তাই নিজেকেই বাঁচতে হবে। আর বাঁচতে গেলে নিজেকেই পথ খুঁজতে হবে। নথি গোছাতে হবে। কথায় বলে, কাগজ মিথ্যা হয় না। এখন আমাদের কাগজই দেখাতে হবে। তাই বার্থ সার্টিফিকেট চাই। ২০০২ সালের ইলেক্টোরাল রোলে নিজের নাম দেখা চাই। সেই কারণেই আজ হয়তো ফুরসত নেই ডোমকলের আমিরুল ইসলাম বা রানিনগরের মিলন মণ্ডলের। তাঁদের সাইবার কাফের বাইরে দীর্ঘ লাইন। মানুষ নেমে পড়েছে নিজের পায়ের তলার জমি শক্ত করতে। ভোটার তালিকায় নাম খুঁজে তারা প্রিন্ট আউট নিয়ে যাচ্ছে। লাইন পড়ছে কৃষ্ণনগর সদর মহকুমা অফিসের সামনে। ছেলেমেয়ের জন্ম শংসাপত্রের ভুল শুধরে নেওয়ার। নিজের পরিচত্রপত্র গুছিয়ে নেওয়ার। পদবি ঠিক করার জন্য ভোর পাঁচটা থেকে লাইনে দাঁড়াবেন ডালিয়া মণ্ডলরা। কখনও তাঁকে আমরা দেখব নদীয়ায়, কখনও বাঁকুড়া, কখনও মুর্শিদাবাদ, কখনও আবার কোচবিহারে। নাম বদলে বদলে যাবে। কিন্তু পরিচয় নয়। তারা প্রত্যেকে এদেশের নাগরিক। ওই পরিচয়টাই যে ধরে রাখতে হবে... এসআইআরের পরও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ