সংবাদদাতা, দিনহাটা: ২০০৬ সাল। দক্ষিণ মশালডাঙা ছিল বাংলাদেশের ছিটমহল। রুটি-রুজির টানে উত্তরবঙ্গের এই প্রান্তের কয়েকজন বাসিন্দা দেশান্তরিত শ্রমিকের মতো পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন দেরাদুনে। সেই দলে ছিলেন দক্ষিণ মশালডাঙার আমির হোসেন। কিন্তু ছিট পেরিয়ে ভারতীয় মূল ভূখণ্ড নাজিরহাটে প্রবেশ করতেই বিএসএফ তাদের আটক করে। সঙ্গে থাকা এক ভারতীয় নাগরিককে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করেছিল। পরে দিনহাটা থানায় তাদের হস্তান্তর করা হয়। কয়েকদিন পর জামিনে মুক্তি পান তাঁরা, কিন্তু ২০০৮ সালে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আদালত তাঁদের সাজা ঘোষণা করে। তিনবছর কারাবাসের পর মুক্তি মেলে তাঁদের।
তৎকালীন সময়ে ছিটমহলবাসীর আন্দোলনের ফলে পুশব্যাক না করে বাংলাদেশি ছিটমহল মশালডাঙাতেই ফেরত পাঠানো হয় ওই পরিবারগুলিকে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোচবিহারের ডাকুরহাটে সভা করতে এলে, দক্ষিণ মশালডাঙার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমির হোসেন। সেই সভায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে একটি শাল উপহার দেন, যা আজও সযত্নে নিজের কাছে রেখেছেন আমির।
পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময় হয়। নাগরিকত্ব পান দক্ষিণ মশালডাঙার বাসিন্দা আমির হোসেনরা। সরকার তাঁদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সহ অন্যান্য সরকারি পরিচয়পত্র প্রদান করে। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজ্যে এসআইআর চালু হওয়ার খবরে ফের অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনাচ্ছে প্রাক্তন ছিটমহলবাসীদের জীবনে। প্রশাসন ২০০২ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব যাচাই শুরু করেছে। ষাটোর্ধ্ব আমির হোসেনের মতো বহু প্রাক্তন ছিটমহলবাসীরই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই। কারণ তখন তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন।
আমির হোসেনের আশঙ্কা, যখন বাংলাদেশি ছিটমহলে ছিলাম, তখন মূল ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকলেই মারধর করা হতো। ২০০৬ সালে আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল। ২০১৫ সালে ভারত সরকার নাগরিকত্ব দিয়ে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড দিয়েছে। এখন বলছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে। তখন তো আমরা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলাম! এবারে এসআইআর হলে কি হবে?
সাবেক ছিটমহল দক্ষিণ মশালডাঙার আর এক বাসিন্দা সাত্তার আজল। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে আমরা ভারতের নাগরিকত্ব পাই। সরকার আমাদের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড দিয়েছে। এখন শুনছি ২০০২ সালের ডকুমেন্ট লাগবে এসআইআরে। সেই সময় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলাম। ছিটমহলের মানুষের জন্য এসআইআরে নিয়ম-কানুন শিথিল করা প্রয়োজন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষগুলি যাতে আর হয়রানির শিকার না হয়। সরকারের কাছে আমরা এই আবেদনই রাখছি।
দক্ষিণ মশালডাঙা সহ বিনিময় হওয়া ৫০টিরও বেশি ছিটমহলের শতশত পরিবার এখন এই আতঙ্কেই দিন কাটাচ্ছে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেয়েও আবার কি হারাতে বসেছে তাদের ‘ভারতীয় পরিচয়’? • চিন্তায় আমির, সাত্তাররা। - নিজস্ব চিত্র।