শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: নামের বানান ঠিক। বয়সের ফারাকও ঠিক যেমনটা কমিশনের নির্দেশিকায় ছিল, তেমনই। অথচ নাম রয়েছে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের তালিকায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আনম্যাপড ও লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা টাঙানোর পরই প্রকাশ্যে এল কমিশনের আরও এক তুঘলকি কাণ্ড। একটি দু’টি নয়, সব কিছু ঠিক থাকার পরও এমন লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে ওই তালিকায়। এখন ওইসব ভোটাররা বলছেন, তালিকা প্রকাশ্যে না এলে বিষয়টি তাঁরা জানতেই পারতেন না। সকলেরই প্রশ্ন, সব ঠিক থাকলেও কেন এই তালিকায় নাম রাখা হল? এর জবাব কে দেবে?
যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার সুভাশিস সাহু। বয়স ৫৬। ইনিউমারেশন ফর্মে নিজের ঠাকুমাকে ‘আত্মীয়’ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন। ২০০২ সালে তাঁর ঠাকুমার বয়স ছিল ৮৩। সেই হিসাব ধরলে ২০২৫ সালে ঠাকুমার বয়স ১০৬ বছর। অর্থাৎ সুভাশিসবাবুর সঙ্গে তাঁর ঠাকুমার বয়সের ফারাক ৫০ বছর। অথচ সুভাশিসবাবুর নাম রয়েছে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের তালিকায়। কমিশনের যুক্তি, ঠাকুমার সঙ্গে নাকি তাঁর বয়সের ফারাক ৪০ বছরের কম। কীভাবে সম্ভব? সহজ অঙ্ক কষলেই প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, ভোটার ও তাঁর আত্মীয়ের বয়সের ফারাক ৫০ বছর। অথচ কমিশন বলছে এই সহজ অঙ্ক মোটেও ঠিক নয়।
শুধু সুভাশিস সাহুই নন। একই বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা নুপুর মুখার্জি, পায়েল মুখার্জির মতো আরও অনেকে রয়েছেন, যাঁদের আত্মীয়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক যথাযথ হলেও তাঁদের নাম রয়েছে সন্দেহজনক ভোটারের তালিকায়। আবার মেদিনীপুরের বাসিন্দা সুব্রত বেরার নাম রয়েছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। সেখানে যে বানান ‘Subrata Bera’। ২০২৫ সালের তালিকাতেও নামের হুবহু একই বানান। তা সত্ত্বেও এই ব্যক্তিকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়াও বলা হয়েছিল, ছয় ব্যক্তি একজনকে বাবা দেখালে তাঁকে সন্দেহজনক হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যিনি চার সন্তানের পিতা, তিনিও রয়েছে ‘ডিএম’ তালিকায়। সূত্রের খবর, রাজ্যজুড়ে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ কমিশনের এই তুঘলকি কাণ্ডের শিকার।
অভিযোগ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিএলওদের জানানোর পরও এই সব ভোটাররা কোনও সদুত্তর পাচ্ছেন না। তাঁদের বলা হচ্ছে, শুনানির নোটিস এলে হাজিরা দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সবকিছু ঠিক থাকলেও কেন এইসব ভোটারের নাম ‘ডিএম’ বা ডিসক্রিপেন্সি ইন ম্যাপিংয়ের তালিকায় রাখা হল? আর কেনই বা তাঁরা শুনানির সম্মুখীন হবেন? ইআরওরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, চোখে দেখেই ফারাক করা যাচ্ছে। কিন্তু কোনও উপায় নেই। যে ভুল রয়েছে, হাতে-কলমে শোধরানোর কোনও ক্ষমতা তাঁদের নেই। সবটাই হচ্ছে সফটওয়্যারের মাধ্যমে। একাধিক ইআরও বলছেন, তাঁদের এই ক্ষমতা দেওয়া হলে ভোটারদের এত হয়রানির শিকার হতে হত না। পাশাপাশি কাজেও সুবিধা হত।
যদিও রাজনৈতিক মহলে দাবি, পাছে সবটা মানুষের সামনে চলে আসে, তাই নিজেদের গলদ ঢাকতেই কমিশন প্রথমে এই তালিকা প্রকাশ্যে আনতে অস্বীকার করছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তালিকা টাঙাতেই সব পরিষ্কার হল।