সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ফিক্সড ডিপোজিটের পর এবার এসআইপি লগ্নি থেকেও সরে আসছে মধ্যবিত্ত! কারণ কী? উদ্বৃত্ত টাকা থাকলে তবেই তো সঞ্চয়! টাকা না থাকলে ফিক্সড ডিপোজিটই কী? আর এসআইপি’ই বা হবে কীভাবে? মোদি জমানায় এফডির কম সুদ বহু মানুষকেই টেনে এনেছিল শেয়ার বাজারে। স্টকে বিনিয়োগ সম্পর্কে যাঁদের সংশয়, তাঁরা টাকা রাখতে শুরু করেছিলেন সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপিতে। কারণ, আয় কমে গিয়ে গত কয়েক বছরে বেকারত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনই বিস্ময়করভাবে বিগত বছরগুলিতে নজরে এসেছে শেয়ার বাজারের ঊর্ধ্বগতি। আলোর দিকে যেমন শ্যামাপোকা আকৃষ্ট হয়, সেভাবেই সাধারণ মানুষও ঝাঁকে ঝাঁকে এসে পড়েছে শেয়ার, এককালীন মিউচুয়াল ফান্ড এবং এসআইপির দুনিয়ায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় যত সংখ্যায় এসআইপি অ্যাকাউন্ট চালু হয়েছিল, তার অর্ধেক বন্ধ। প্রায় ৪ কোটি এসআইপি রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালের শেষে এসে দেখা গিয়েছে, ওই চালু হওয়া এসআইপি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১ কোটি ৯০ লক্ষ গ্রাহকই কিস্তির টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে টাকাও তুলে নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নতুন এসআইপি রেজিস্ট্রেশনের দু’বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়েছে ৪৮ শতাংশ অ্যাকাউন্ট। বিস্ময়কর হল, যে সময়সীমায় এই অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে, সেই সময় শেয়ার বাজারের উড়ান রেকর্ড ছুঁয়েছিল।
সুদের হার কম। এদিকে পাহাড়প্রমাণ মূল্যবৃদ্ধি। তাই নতুন প্রজন্ম তো বটেই, চিরাচরিত ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ে অভ্যস্ত সাধারণ মধ্যবয়স্ক মধ্যবিত্তও কয়েক বছর ধরে অনেক বেশি ঝুঁকেছে মিউচুয়াল ফান্ডে। শেয়ার মার্কেটের উল্কার গতি সাধারণ মানুষকে অনেক বেশি আগ্রহী করেছে বলেই শেয়ার বাজার, এককালীন মিউচুয়াল ফান্ড এবং এসআইপি সেক্টরে গত কয়েক বছরে বিপুল লগ্নি হয়েছে। শেয়ার বাজারের মার্কেট ভ্যালুও লক্ষ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তার নেপথ্যে মূলত রিটেল লগ্নিকারীরা। অর্থাৎ, সাধারণ মধ্যবিত্ত। এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সবথেকে বেশি ধাক্কা খেয়েছে চিরাচরিত মধ্যবিত্ত সঞ্চয় প্রবণতা—ফিক্সড ডিপোজিট। আবার কেন্দ্রীয় সরকার একের পর এক বাজেটে শুধু নতুন আয়কর কাঠামোয় বেশি ছাড় দেওয়ায় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহও কমেছে। কারণ, এলআইসি বা স্বল্প সঞ্চয়ে লগ্নি করে ৮০সিতে যা ছাড় পাওয়া যাচ্ছে, তা বাদ দিয়েও নতুন কাঠামো বেশি লাভজনক। সুতরাং কমে গিয়েছে স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের আকর্ষণও। তাই সঞ্চয়ের একমাত্র গন্তব্য? শেয়ার বাজার। কিন্তু সংসার ও নিত্যদিনের ব্যয় সামলে উদ্বৃত্ত অর্থে ক্রমেই টান পড়েছে। তাই এসআইপি অ্যাকাউন্ট চালু হওয়া যেমন বিপুল পরিমাণে বেড়েছে, তেমনই তার আড়ালে পুরনো অ্যাকাউন্ট একে একে বন্ধও হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশন অব মিউচুয়াল ফান্ড অব ইন্ডিয়ার সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। একে বলা হচ্ছে প্রিম্যাচিওর ক্লোজার। সাধারণত এসআইপি অথবা মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। অন্তত তিন বছর। তারপরও কিন্তু প্রিম্যাচিওর ক্লোজার বাড়ছে। কেন? মূল্যবৃদ্ধির চাপ। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত মানুষ বুঝতে পারছে না, আগামী মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আবার এসআইপি অ্যাকাউন্টে রাখা যাবে কি না। অন্যদিকে বিপুল ধস নামছে শেয়ার বাজারে। তাহলে মানুষ সঞ্চয় করবে কোথায়? বিকশিত ভারতে মধ্যবিত্তের আর্থিক বিকাশের রাস্তা বন্ধ!