অভিষেক পাল, বহরমপুর: ‘মহারাষ্ট্র পুলিসকে আমরা সমস্ত পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের মোবাইল আর পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে বিএসএফের হাতে তুলে দিল। আমরা যে ভারতীয়, তা প্রমাণ করতে জাতীয় সঙ্গীত গিয়েছিলাম, কেউ বিশ্বাস করেনি। উল্টে বিএসএফ মেরে সারা গায়ে কালশিটে ফেলে দিয়েছে।’ ঘরে ফিরে মহারাষ্ট্র পুলিস ও বিএসএফের অত্যাচারের এমনই করুণ কাহিনি শুনিয়েছেন বাংলাদেশি সন্দেহে পুশব্যাক হওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিস ও প্রশাসনের চেষ্টায় মুক্তির স্বাদ পেলেও এখনও তাঁদের মন থেকে আতঙ্কের রেশ কাটছে না।
বাংলায় কথা বলার জন্য মুম্বই পুলিস তাঁদের বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। মুর্শিদাবাদের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও ওই চার পরিযায়ী শ্রমিককে ‘পুশব্যাক’ করা হয় বাংলাদেশে। সীমান্ত পার করার আগে বিএসএফ নির্মম অত্যাচার চালায় তাঁদের উপর। বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। অবশেষে জেলা প্রশাসনের তৎপরতায় মুর্শিদাবাদের চার পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফেরেন। হরিহরপাড়া থানার ডল্টনপুর গ্রামের বাসিন্দা শামিম খান ও তরতিপুরের বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন মণ্ডলকে এদিন থানায় ডেকে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন বিধায়ক নিয়ামত শেখ এবং ভারপ্রাপ্ত পুলিস আধিকারিকরা। তাঁদের এই বলে আশ্বস্ত করা হয় যে, আতঙ্কের কিছু নেই, রাজ্য সরকার এবং জেলা প্রশাসন তাঁদের পাশে আছে।
শামিম বলেন, খুব ভালো লাগছে এখন। তবে এতদিন যে কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছি তা বলার ভাষা নেই। বাংলাদেশে এক রাত একদিন কাটাতে হয়েছে। একটা জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম। রাস্তা খুঁজে এ পারে আসার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি। ওপারে পাঠানোর আগে বিএসএফ প্রচণ্ড মারধর করেছে। আমার সারা গায়ে কালশিটে পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা মুম্বই শহরে কাজ করি। মহারাষ্ট্রের পুলিস গত সপ্তাহে জোর করে আমাদের বিএসএফের হাতে তুলে দিয়ে বর্ডার পার করে দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারকে আমি বলতে চাই, এভাবে বাংলার মানুষের উপর নির্যাতন করলে কোনওদিন পশ্চিমবঙ্গে তোমরা জিততে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কোনও জায়গা নেই।
হরিহরপাড়ার বিধায়ক তথা বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের চেয়ারম্যান নিয়ামত শেখ বলেন, রাজ্যসভার সাংসদ তথা পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলামকে আমরা গোটা ঘটনার কথা জানিয়েছিলাম। তাঁরা অনেক চেষ্টা করেছেন। জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিস সুপারের মাধ্যমে চেষ্টা করে আজকে এই ফলাফল আমরা পাচ্ছি। কেন মুম্বই পুলিস আমার এলাকার লোকজনকে এভাবে কিছু না জেনে এমন করল? তাদের এই নীতিকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারি না। দুজনকেই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হল। তাঁদের পাশে আমরা আছি। প্রশাসনকেও ধন্যবাদ জানাই।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার যদিও এই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভারতীয় বলে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, শ্রমিকরা বলছে যে তারা ভারতীয়। কিন্তু সে তো সত্যিবাদী যুধিষ্ঠির নয়। তাকে ডকুমেন্ট দেখাতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে সে ভারতীয়। মুর্শিদাবাদে অনেক পরিযায়ী শ্রমিকই আছে, যারা আদতে বাংলাদেশের নাগরিক।