Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

সহ্যাদ্রি পাহাড়ের কোলে সিংহগড় কেল্লা

মহারাষ্ট্রের বনেদি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এখানকার মারাঠা সাম্রাজ্য নানা যুদ্ধবিদ্রোহের প্রতিকূলতায় বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে। কখনও মোগলদের আক্রমণ, কখনও শক–হুন–পাঠান ও ব্রিটিশদের অযাচিত হামলা।

সহ্যাদ্রি পাহাড়ের কোলে সিংহগড় কেল্লা
  • ২৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মহারাষ্ট্রের বনেদি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এখানকার মারাঠা সাম্রাজ্য নানা যুদ্ধবিদ্রোহের প্রতিকূলতায় বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে। কখনও মোগলদের আক্রমণ, কখনও শক–হুন–পাঠান ও ব্রিটিশদের অযাচিত হামলা। এই বিপর্যয় ও বৈদেশিক হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য মূলত ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সহ্যাদ্রি পাহাড়ঘেরা মহারাষ্ট্রে দুর্গগুলির স্থাপন এক অনন্য নজির। উঁচু ও প্রশস্ত নজরমিনার সহ দুর্গগুলি মারাঠাদের বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। বর্তমানে বেশ কিছু দুর্গ ভগ্নপ্রায় হলেও পশ্চিমঘাটের প্রেক্ষাপটে কিছু দুর্গ এখনও পর্যটকদের কাছে এক লোভনীয় দ্রষ্টব্য। 

Advertisement

সিংহগড় দুর্গ, যাকে অনেকে আবার সিংগড় দুর্গও বলেন, মহারাষ্ট্রর পুণে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অঞ্চলের এক কেল্লা। ই঩তিহাস যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে গাঁথা। প্রচুর যুদ্ধের সাক্ষী এই দুর্গটির প্রথমে নাম ছিল ‘কোন্দানা’।  বলা হয় বহুকাল আগে এখানে কৌদিন্য বা শৃঙ্গী ঋষির আশ্রম ছিল। এই দুর্গের অভ্যন্তরে কৌন্দিনেশ্বর মন্দিরের অবস্থান থেকেও সেকথাই প্রমাণিত হয়। সহ্যাদ্রি পর্বতমালার ভুলেশ্বর রেঞ্জের একটি পাহাড়টিলায় অবস্থিত সিংহগড় দুর্গটির উচ্চতা ৪৩০৪ ফুট। প্রাকৃতিকভাবেই এর অত্যন্ত গভীর ঢাল দুর্গটিকে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। দুর্গটির মূল প্রবেশদ্বার দু’টি। দক্ষিণে কল্যাণ দরজা ও উত্তরপূর্বে পুণে দরজা। মারাঠা সাম্রাজ্যের অন্যান্য দুর্গ যেমন করায়ত্ত টরণা দুর্গ, রায়গড় দুর্গ, পুরন্দর দুর্গের মতো এটিও একটি।
অতীতের দিকে নজর রাখলে, জানা যায়, ‘কোলি’ সম্প্রদায়ের এক মুখিয়া, নাগ নায়েক-এর কাছ থেকে মহম্মদ বিন তুঘলক তাঁর রাজত্বকালের শুরুর দিকেই কোন্দানা দুর্গটি জবরদখল করেন। এর অনেক বছর পরে, পুণে অঞ্চলের নবাব প্রথম ইব্রাহিম আদিল শাহ এই দুর্গে তাঁর লস্করকেন্দ্র বানিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সুবেদার শাহজি ভোঁসলের ওপর এই কোন্দানা দুর্গের দায়িত্ব দেন। শাহজির পুত্র শিবাজি কিন্তু আদিল শাহের একাধিপত্য স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না মোটেই। শিবাজি সেইসময় ‘হিন্দুভি স্বরাজা’ নামে নিজস্ব মারাঠারাজ সংগঠন নির্মাণ করার প্রয়াসী ছিলেন। ১৬৪৭ সাল নাগাদ আদিল শাহের এক পার্শ্বচর সিদ্দি আহমেদকে হাত করে শিবাজি এই দুর্গটির প্রতিরক্ষার ব্যাপারে খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড় করেন এবং সেখানে তাঁর আধিপত্য কায়েম করেন। বাপুজি মুদ্গল দেশপান্ডে সেই মন্ত্রণার মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন। আদিল শাহ পরে সব জানতে পেরে সিদ্দি আহমেদকে কারাগারে পাঠান। এবং শাহজিকেও আটক করে কারাবন্দি করেন। পরে অবশ্য ছেড়েও দেন। ১৬৫৬ সালে শিবাজি আবার দুর্গটি পুনর্দখল করেন। পরে আবারও তা হাতবদল হয়ে দখল হয়ে যায়। ১৬৭০ সালে শিবাজি আবার তৃতীয়বারের মতো কোন্দানা দুর্গটি জয় করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য এটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। 
১৬৭০ সালের যুদ্ধে, শিবাজির বীর সেনানীদের মধ্যে অন্যতম তানাজি মালুসারে নামে কোলি সম্প্রদায়ভুক্ত একজন সর্বময় সেনাধ্যক্ষ বড় ভূমিকা পালন করেন। অসম সাহসী তানাজি মালুসারে অদ্ভুত কর্মকুশলতায় দুর্গটির একটি পাথরে লম্বা দড়ি আটকে সেই দড়ি বেয়ে দুর্গম এই দুর্গে পৌঁছেছিলেন। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তানাজি প্রাণ দেন। এর আবার একটু প্রাককথন রয়েছে। সেই সময় তানাজির পুত্রের বিয়ে ছিল। কিন্তু দেশপ্রাণ তানাজি নিজের পুত্র রায়বা-র বিয়েতে উপস্থিত না থেকে এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত হন। তাঁকে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন। আগে পুত্র রায়বার বিবাহ মিটুক, তারপরই যুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তব্যে অবিচল তানাজি বলেছিলেন, ‘আধি লগ্ন কোন্দাওঞ্চ মগ রায়বাঞ্চ’। মারাঠি এই বাক্যবন্ধটির বাংলা তর্জমা করলে কথাটির মানে হল, ‘প্রথমে কোন্দানা যুদ্ধ, পরে পুত্রের বিবাহ’। শিবাজি এই অমর বীর শহিদের স্মৃতিতে কোন্দানা দুর্গটির নতুন নামকরণ করেন সিংহগড় কেল্লা। শিবাজি বলতেন, ‘গড় আলা, পান সিঙ্ঘা গেলা’ অর্থাৎ কেল্লাটি জয় হল, কিন্তু সিংহবিক্রম মানুষটির প্রাণ চলে গেল।’
সপ্তাহান্তিক ভ্রমণে পুণেকর ও মুম্বইকরদের জন্য একটি অন্যতম পর্যটনস্থল সিংহগড় কেল্লা ও তার আশপাশ। মুম্বইয়ে বিগত দশ বছর থাকার সুবাদে, আমাদের কাছে সিংহগড় কেল্লাটি ছিল উইকএন্ড গেটওয়ে। পাহাড়ের নীচে সিংহগড় কেল্লার নামের অনুরূপ সিংহগড় গ্রাম থেকে অতিউৎসাহী পর্যটকরা ট্রেকিং করে ২.৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গের শীর্ষে অভিযান করেন। কেল্লাটিতে প্রবেশ করলে এর নির্মাণ রণনীতি কৌশল যে সেসময় কত তুখোড় ছিল আন্দাজ করা যায়। দুর্গের ভেতর আছে কালীমাতা মন্দির, ও মন্দিরের দক্ষিণে একটি হনুমানের মূর্তি আছে। এখানে সেই যুগের সৈনিক আস্তাবল, সুরার আড়ত, শস্যভাণ্ডার ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়। বিখ্যাত ‘হাওয়া পয়েন্ট’ যেখান থেকে কুয়াশা মেঘ আর বৃষ্টির অদ্ভুত মাদকতা টের পাওয়া যায়। ‘কারে লোত’ নামে আরও একটি বিখ্যাত পয়েন্ট আছে, যেখান থেকে সেই সময় দোষীদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হতো নীচের পাহাড়ি গর্তে। এখানে একটি মিষ্টি জলের কুয়া রয়েছে। আছে মহারাজ ছত্রপতি  শিবাজি প্রদত্ত ‘সিংহ হৃদয়’ বা ‘লায়ন্স হার্ট’ নামকরণ বিভূষিত বীর তানাজির স্মারক স্মৃতি সৌধ। শিবাজির বংশজ রাজারামের মাত্র ৩০ বছর বয়েসে এই কেল্লার মধ্যেই মৃত্যু হয়। এখানে রাজারামের সমাধি মন্দিরও আছে। মোগল আমলে এই কেল্লা রক্ষাকারী উদয়ভান রাঠোরেরও একটি স্মারক মজুত আছে। স্বতন্ত্র সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলকের গ্রীষ্মাবাস ছিল এই কেল্লার একটি অংশে। তিনি প্রায়শই এখানে এসে থাকতেন। ১৯১৫ সালে মহাত্মা গান্ধীও একটি বৈঠক উপলক্ষে তিলকের সঙ্গে দেখা করতে এখানে আসেন। 
কেল্লার গল্প শুরু করলেই এর অতীত ইতিহাসের কথা আসবে। কারণ দুর্গ বা কেল্লা মানেই তো ইতিহাসের গর্বিত পাণ্ডুলিপি। ভারতের প্রাচীন কেল্লাগুলি শুধুই অতীত ঐতিহ্যে ভাস্বরই নয়, এর গঠন স্থাপত্য, পরিকাঠামো, ভৌগোলিক অবস্থান, পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। পর্যটকদের কাছেও এর আকর্ষণ যথেষ্ট। প্রচুর পর্যটক বছরভর আসেন এই কেল্লা দর্শনে। আর বর্ষার ঠিক পর পরই সবুজের পরশে দুর্গের চেহারা বদলে যায়। দুর্গ ও সহ্যাদ্রির পরিবহে তখন শুধু একটাই রং, সবুজ, আরও সবুজ।
কীভাবে যাবেন:  কলকাতা থেকে রেলপথে বা আকাশপথে মুম্বই বা পুণে। সেখান থেকে ক্যাব বুক করে সিংহগড় দুর্গ। মুম্বই থেকে কেল্লাটি যেতে সময় লাগে মোটামুটি ৩ ঘণ্টা। পুণে থেকে সময় লাগে ঘণ্টা দেড়েক। পুণে থেকে গাড়িতে আতেকর পর্যন্ত গিয়ে সেখানে গাড়ি রেখে অনেকে ট্রেক করেও ওপরে ওঠেন। 
কখন যাবেন: সেরা সময় জুন থেকে ফেব্রুয়ারি। বর্ষায় ভ্রমণ এখানে মনোরম। স্থানীয় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে সারা বছর। সকাল 
১০টার মধ্যে পৌঁছতে পারলে অনেকটা সময় ধরে ভালো করে কেল্লা ভ্রমণ করা যাবে।   
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ