Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুগপৎ গাফিলতি ও নির্বুদ্ধিতা

পর পর দুটি বিস্ফোরণ। দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ শহরে। ব্যবধান মাঝখানে তিনদিনের এবং আটশো কিমির। ১০ নভেম্বর, সোমবার প্রথম বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল দেশের রাজধানী শহর নয়াদিল্লি।

যুগপৎ গাফিলতি ও নির্বুদ্ধিতা
  • ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পর পর দুটি বিস্ফোরণ। দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ শহরে। ব্যবধান মাঝখানে তিনদিনের এবং আটশো কিমির। ১০ নভেম্বর, সোমবার প্রথম বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল দেশের রাজধানী শহর নয়াদিল্লি। তার তিনদিন পর শুক্রবার মধ্যরাতে আর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উল কাশ্মীরের শ্রীনগর। নয়াদিল্লিতে বিস্ফোরণ হয়েছিল লালকেল্লোর অদূরে একটি গাড়ির ভিতরে। তারপর তা ‘সংক্রামিত’ হয় নিকটবর্তী অনেকগুলি গাড়িতে। ওই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩। লালকেল্লা বিস্ফোরণ কাণ্ডের তদন্তে ফরিদাবাদ থেকে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বাজেয়াপ্ত করা হয়। তারই কিছুটা আনা হয়েছিল শ্রীনগরের নওগাঁও থানায়। শুক্রবার সেই নমুনা পরীক্ষার সময়ই ঘটে যায় চিন্তার অতীত ভয়াবহ বিস্ফোরণ। শনিবার পর্যন্ত নওগাঁওয়ে নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। জখম আরও অন্তত ২৯ জন। দিল্লি বিস্ফোরণে অভিযুক্ত মেডিকেল মডিউলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ডাঃ মুজাম্মিলের ফরিদাবাদের ডেরা থেকেই ওই বিস্ফোরকের ‘পাহাড়’ মেলে। শুক্রবার রাতে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল থানায় সেটির নমুনা পরীক্ষা করছিল। অভাবনীয় বিস্ফোরণটি ঘটে তখনই। যাঁরা জখম হয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই পুলিশকর্মী এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই প্রবল ছিল যে মৃতদের দেহাংশ দূরে দূরে ছিটকে পড়ে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় নওগাঁও থানা ভবনটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমনকি আশপাশের একাধিক বাড়িতেও স্পষ্ট এই বিস্ফোরণের অভিঘাত। পুড়ে গিয়েছে একাধিক গাড়ি। গত অক্টোবরে একাধিক হুমকি পোস্টার নজরে আসে। নওগাঁও থানার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ছিল ওই হুমকির লক্ষ্য। ওই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতারও করে। তাদের জেরাতেই হোয়াট কলার সন্ত্রাসবাদীদের চক্রান্ত পরিষ্কার হয়। চক্রান্তের মূলে যে আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল মডিউল ছিল, জানা যায় তাও। সেই সূত্র ধরে মুজাম্মিলের ফরিদাবাদের ভাড়া বাড়িতে হানা দেওয়া হয়। নওগাঁও থানা থেকে ফরেন্সিক টিম তার নমুনা নিয়েছিল। রাসায়নিক, রি-এজেন্ট এবং বিস্ফোরক উপকরণকে পৃথক করে রাখার কাজও শেষ হয়। সেই প্রক্রিয়া চলাকালীন অবশ্য কোনও অঘটন ঘটেনি। বরং সর্বোত্তম সতর্কতায় সেই পর্ব সমাপ্তান্তেই নওগাঁও থানায় বিস্ফোরণটি ঘটে! 

Advertisement

স্বভাবতই বিশেষজ্ঞদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এটা কীভাবে সম্ভব হল? এই বিস্ফোরণের সঙ্গে কি কুখ্যাত পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী জয়েশ-ই-মহম্মদের শাখা সংগঠন পিএএফএফ জড়িত? জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এখনও তেমন কোনও সূত্র পায়নি। জমে থাকা বিস্ফোরক পদার্থ বিস্ফোরণের অতীত ইতিহাস আছে। এটা কি নিছক তাই? রহস্য দানা বেঁধেছে এই প্রশ্ন ঘিরে। তার পিঠে আরও প্রশ্নও, মেডিকেল মডিউলের তরফে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের আসল চরিত্রটা ঠিক কী? টাইমার, ডিটোনেটর, রি-এজেন্ট প্রভৃতির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে শুধুই কি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট? যদিও কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির একটি সূত্রের অনুমান, এটি ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) নামের একটি নতুন ধরনের শক্তিশালী বিস্ফোরক। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের মতো রাসায়নিকের সঙ্গে সেটি মিশিয়ে আইইডি তৈরি হয়। লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণে ব্যবহৃত আই-২০ গাড়িতে টিএটিপির অস্তিত্ব পেয়েছে এফএসএল। দিল্লি বিস্ফোরণের সঙ্গে নওগাঁও বিস্ফোরণে সাদৃশ্যও চিহ্নিত করেছেন তদদন্তকারীরা। তবু বিস্ফোরক রহস্য এখনও রহস্যই রয়ে গিয়েছে। কারণ রিমোট কন্ট্রোল কিংবা টাইমার চালিত বিস্ফোরকের ‘গন্ধ’ মেলেনি এখনও। 
বিস্ফোরকের প্রকৃতি এবং চরিত্র সুকৌশলে ধ্বংস করা হয়নি তো? আড়ালে কে—আরও কোন বড়ো চক্র সক্রিয়? ভয়াবহ ধরনের বিস্ফোরক, তাও আবার পাহাড়প্রমাণ পরিমাণে, ফরিদাবাদ থেকে বহুদূরে শ্রীনগরে নিয়ে যাওয়াটা কি বোকামি হয়নি? আবার সেখানে নিয়েও যখন যাওয়া হল, তা একেবারে থানার মালখানায় রাখা হল কোন কাণ্ডজ্ঞানে? একে কি যুগপৎ গাফিলতি ও নির্বুদ্ধিতা বলা হবে না? যাই হোক, সদুত্তর মিলছে না কোনও কর্তার কাছ থেকেই। শুধু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুগ্মসচিব (কাশ্মীর) প্রশান্ত লোখান্ডে আরও গভীর তদন্তের উপর জোর দিয়েছেন। কাশ্মীর পুলিশ, এনআইএ এবং দিল্লি পুলিশ একযোগে কাজটি করবে। লালকেল্লার বিস্ফোরণ, মেডিকেল টেরর মডিউল, রহস্যজনক বিস্ফোরক এবং বিদেশি সংযোগ—রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দেশের দুই প্রান্তে সংঘটিত জোড়া বিস্ফোরণ, সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ। তদন্তকারী উয়ং, গোয়েন্দা বিভাগ এবং দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি সকলের জন্যই। আশা করা যায়, তাঁরা মিলিতভাবে এই রহস্য উদ্ঘাটনে সফল হবেন। দেশের শান্তি-সুস্থিতি রক্ষা এবং কোটি কোটি নাগরিকের নিরাপত্তার স্বার্থে সফল তাঁদের হতেও হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ