তন্ময় মল্লিক: ‘আমার বাড়ি মুর্শিদাবাদ। গত দু’দিন আগে আমার নম্বরে একটি ফোন আসে। বলে, স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাশ করে চাকরি করতে চাও? ১৪ লক্ষ টাকা লাগবে। প্রশ্নপত্র নেওয়ার জন্য দিতে হবে ৫০ হাজার। ইন্টারভিউয়ের সময় আট লক্ষ। বাকিটা চাকরি পাওয়ার পর।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় করা অরিন্দম পালের পোস্টের বিষয়বস্তু ছিল মোটামুটি এই রকম। আর জি করের ঘটনার সময় ‘আমি সোমা বলছি’ স্টাইলে এবারও টাকার বিনিময়ে চাকরি হবে, সেটা মানুষের মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন অরিন্দম। তাঁর দাবিকে বাস্তব সম্মত করার জন্য তিন দফায় টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি অবশ্যই আর জি করের মতো স্পর্শকাতর নয়। কিন্তু জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ বেকারের ভবিষ্যৎ। তাকে ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। তাই উদ্দেশ্য ভয়ঙ্কর। আর কাজটা যে ঠিক হচ্ছে না, সেটা অরিন্দম খুব ভালো করেই জানতেন। তারজন্য ঠিকানা ভুল বলেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। প্রশাসন সতর্ক থাকায় ব্যর্থ হয়েছে ঘেঁটে দেওয়ার যাবতীয় অপচেষ্টা।
শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা বানচাল করতে গোড়া থেকেই উঠেপড়ে লেগেছিল বিরোধী শিবির। সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়ায় অনেকে ভেবেছিলেন, চাল থেকে কাঁকর আলাদা করা যাবে। তাতে নিশ্চিত হবে যোগ্যদের চাকরি। তদন্তভার হাতে নিয়েই রাজ্যের কিছু নেতা, মন্ত্রী ও এসএসসির কর্তাকে টপাটপ জেলে ভরায় সেই আস্থা মজবুত হয়েছিল। কিন্তু তারা অযোগ্যদের তালিকা আদালতে দিতে না পারায় যোগ্যদের দ্বিতীয়বার ‘অগ্নিপরীক্ষা’য় বসতে হল।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আমলে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ নিয়ে যে দুর্নীতি হয়েছে, তা প্রমাণিত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই নেওয়া হচ্ছে নতুন করে নিয়োগের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা বানচাল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন কয়েকজন বাম ও বিজেপি নেতা। তাঁদের ইন্ধনেই শিক্ষক ও চাকরি প্রার্থীরা বারবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু সেসব দাবি ও অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে বিচারপতিরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, আদালত নিয়োগের পক্ষে। সম্ভবত তাঁরাও বুঝেছেন, যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষকদের নিয়ে বিরোধীরা শুধু রাজনীতিই করেছে। সুরাহা চায়নি। তাই সমস্যা সমাধানের রাস্তা দেখিয়েছে আদালত।
একথা ঠিক, সুপ্রিম কোর্ট প্যানেল বাতিল করায় যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা চরম হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের চাকরি ঘিরে বছরের পর বছর চলা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে আদালত। দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্যানেল বাতিল এবং রাজ্য সরকারের রিভিউ পিটিশন খারিজের পর চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। একথা একটা শিশুও জানে। তা সত্ত্বেও বিরোধীরা পরীক্ষার দু’দিন আগেও সেই দাবিই জানিয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। আর তখনই তোলা হল প্রশ্ন বিক্রির মতো মারাত্মক অভিযোগ। উদ্দেশ্য, চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে পরীক্ষার দিন বিশৃঙ্খলা পাকানো। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার গৃহশিক্ষক অরিন্দমবাবুর পোস্ট সেই যড়যন্ত্রেরই অঙ্গ বলে মনে করছে পুলিশ।
শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ স্কুল সার্ভিস কমিশন নিয়েছে। চাকরি প্রার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পরীক্ষার ওএমআর শিটের কার্বন কপি। ফলে তাঁরা কেমন পরীক্ষা দিয়েছেন, ৬০এর মধ্যে কত নম্বর পেতে পারেন, তার মূল্যায়ন নিজেরাই করতে পারছেন। রেজাল্ট বের হওয়ার পর কেউ অবিচারের শিকার হয়েছেন মনে করলে তিনি অনায়াসেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ওএমআর শিটের কার্বন কপি হবে মোক্ষম অস্ত্র।
রাজ্য সরকার এবার শিক্ষক নিয়োগ ইস্যুতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস দূরের কথা, পরীক্ষার দিন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আন্দোলনকারী যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষকরাও পরীক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের অনেকে প্রতিবাদ জানাতে কালো জামা পরে, কালো ব্যাজ লাগিয়ে পরীক্ষায় বসেছেন। সেটা করার অধিকার তাঁদের আছে। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু সকলেই বলেছেন, পরীক্ষা ভালো হয়েছে। প্রশ্ন নিয়ে কোনও ক্ষোভ নেই।
তবে, প্রশ্নের মান নিয়ে বিরোধীদের কেউ কেউ কথা বলছেন। তাঁদের বক্তব্য, এটা শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার উপযোগী প্রশ্ন হয়নি। প্রশ্ন যে সহজ হয়েছে, তা সকলেই মানছেন। অনেকে বলছেন, যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাকরি পাওয়ার পথ সুগম করার জন্যই প্রশ্ন সহজ করা হয়েছে। যোগ্য শিক্ষকদের স্কুলে গিয়ে ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। ফলে সময় তেমন পাননি। প্রশ্ন কঠিন হলে ‘কাট অব মার্ক’ অতিক্রম করা সহজ হতো না। সেক্ষেত্রে তাঁরা ‘ইন্টারভিউ বোর্ড’ পর্যন্ত পৌঁছতে পারতেন না। কিন্তু প্রশ্ন সহজ হওয়ায় সেই সংশয় থাকছে না বললেই চলে। আর যোগ্যরা ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে তাঁদের চাকরি একপ্রকার নিশ্চিত বলেই ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।
পরীক্ষার মোট নম্বর ১০০। তার মধ্যে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে ৬০ নম্বরের। যোগ্য শিক্ষকরা অভিজ্ঞতার জন্য ১০নম্বর এমনিতেই পেয়ে যাবেন। বাকি ৩০ নম্বরের মধ্যে ১০ নম্বর আছে পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের উপর। সেখানে তাঁদের বেশিরভাগই আট থেকে দশ নম্বর পেয়ে যাবেন। বাকি ২০ নম্বরের মধ্যে ১০ নম্বর রয়েছে ‘টিচিং এবিলিটি’র উপর। আট বছর ধরে স্কুলে পড়ানোয় তাতে তাঁরা ভালো নম্বর পাবেন, এটা আশা করা যেতেই পারে। আর ১০ নম্বর ইন্টারভিউ। সেক্ষেত্রেও চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের বেশিরভাগই ‘ফ্রেশার্স’দের তুলনায় খারাপ করবেন না। ফলে ইন্টারভিউয়ে ডাক পেলে যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে অনেকে মনে করছেন।
এরপর থাকছে যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষকদের পোস্টিং এবং স্কেলের বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যোগ্য শিক্ষকরা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি করবেন। আশা করা যায়, তার আগে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল বেরিয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাঁদের বর্তমান স্কুলে পোস্টিং দিলে সরকার এবং শিক্ষক উভয়পক্ষেরই লাভ। আট বছর ধরে চাকরি করায় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটা ‘বন্ডিং’ গড়ে উঠেছে। তাঁরা যে জায়গায় চাকরি করছেন, সেখানে পোস্টিং পেলে তা অটুট থাকবে।
এছাড়া থাকছে চাকরিহারাদের সিনিয়রিটির বিষয়টি। তাঁরা আট বছর ধরে চাকরি করছেন। ফলে ইনক্রিমেন্ট পেতে পেতে তাঁরা যে বেতন পাচ্ছেন, সেটা নতুন স্কেলের চেয়ে অনেকটাই বেশি। তাঁদের দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে এসএসসির দুর্নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের জন্য। এক্ষেত্রে যোগ্য শিক্ষকদের কোনও দোষ নেই। তাই যদি সরকার যোগ্য শিক্ষকদের ‘সার্ভিস ব্রেক’ রুখে দিতে পারে তাহলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না। তাতে জমা ক্ষোভ অনেকটাই দূর হবে।
আগামী কাল রবিবার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা। এই পরীক্ষা যদি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, নিয়োগ ইস্যুতে বিরোধীদের রাজনীতি করার রাস্তাটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে। তবে, সেটা বন্ধ হবে ভাবলে ভুল হবে। কারণ এরপর রয়েছে ইন্টারভিউ। সেই ইন্টারভিউ নিয়েও বিরোধীরা বাজার গরম করতে চাইবে। অনেক রকম অভিযোগ তুলে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করবেই। আর তাতেও কাজ না হলে শেষ কামড়টা বসাবে প্যানেল প্রকাশের পর।
অনেকেই বলছেন, যে কোনও মূল্যে ছাব্বিশের নির্বাচন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ আটকে রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাবে বিরোধীরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আপাতত এটাই শেষ অস্ত্র। কারণ এসআইআরের সৌজন্যে এ রাজ্যে লক্ষ লক্ষ ভোটার বাদ দিয়ে ক্ষমতা দখলের যে আশা বিরোধীরা করেছিল তাতে জল ঢেলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ১২তম নথি হিসেবে আধার কার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে যাকে সামনে রেখে এতদিন বাংলা দখলের স্বপ্ন বিজেপি তাদের কর্মীদের দেখাচ্ছিল, আদালতের রায়ে ঘটেছে তার পরিসমাপ্তি।
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চাইছে। সেটা করতে পারলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, চাকরিহারা শিক্ষকদের জন্য শেষপর্যন্ত লড়াইটা করলেন কে? অনেকে বলছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এই ডিসেম্বরেই স্পষ্ট হয়ে যাবে বাংলায় ছাব্বিশের নির্বাচনের দেওয়াল লিখন।