ড. বিদ্যুৎ পাতর: সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ আমাদের কাছে খুব চেনা দৃশ্য। এতটাই চেনা যে অনেক সময় আর মন দিয়ে দেখা হয় না। কর্তব্য পথে সারি সারি সৈনিক হাঁটেন, ব্যান্ড বাজে, আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন ওঠে। এই চেনা দৃশ্যের মধ্যেই ‘রাষ্ট্র’ প্রতি বছর নিজের পরিচয় নতুন করে লেখে। কাকে সামনে আনা হবে, কাকে আড়ালেই রাখা হবে এই সিদ্ধান্তগুলিই বলে দেয় সাধারণতন্ত্র কাদের কথা ভাবছে। সারা দেশজুড়েই এই দিনে পতাকা উত্তোলন হয়, সশস্ত্র বাহিনী ও স্কুলপড়ুয়া শিশুদের কুচকাওয়াজ হয়। তবু দিল্লির কর্তব্য পথের কুচকাওয়াজ আলাদা করে চোখে পড়ে। এখানেই রাষ্ট্র নিজেকে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে মঞ্চস্থ করে। ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একসঙ্গে প্রদর্শিত হয়। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে শহিদদের স্মরণ করা হয়, সাহসিকতার জন্য সামরিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের সম্মান জানানো হয়, শিশুদের অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয় ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বাল পুরস্কার’। ২০২৬ সালে পরিচিত এই গল্পে একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে চলেছে। প্রথমবারের মতো সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাণীরা। উট, টাট্টু, কুকুর, শিকারি পাখি। অনেকের কাছে এটি অভিনব দৃশ্য হতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে দেখলে বোঝা যায়, এই সংযোজন আসলে অনেকদিনের নীরবতার ভাঙন বা বলা ভালো দীর্ঘদিন উপেক্ষিত এক উপস্থিতির প্রকাশ।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ থেকেই এই অনুষ্ঠান ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে এসেছে। ঔপনিবেশিক শাসন যে সামরিক প্রদর্শনের কাঠামো তৈরি করেছিল স্বাধীন ভারত তা ছুড়ে ফেলে দেয়নি। বরং সেই কাঠামোর ভেতরেই নতুন অর্থ বসিয়েছে। সাম্রাজ্যের শক্তি বদলে হয়েছে সাধারণতন্ত্রের আত্মপ্রকাশ। তখন সেই প্রদর্শন জরুরি ছিল। নতুন রাষ্ট্রকে নিজের অস্তিত্ব জানাতে হত। তারপর সময় বদলেছে। কুচকাওয়াজে এসেছে রাজ্যগুলির ট্যাবলো, লোকসংস্কৃতি, শিশুদের নাচ, নাগরিক অংশগ্রহণ। শক্তি প্রদর্শনের সংজ্ঞা ধীরে ধীরে বদলেছে। অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংস্কৃতি, শৃঙ্খলার সঙ্গে বৈচিত্র্য। কিন্তু এই বিস্তৃতির মধ্যেও কোথাও যেন একটি সীমা টানা ছিল। রাষ্ট্রের গল্প বরাবরই মানুষের গল্প হয়ে থেকেছে। আধুনিক রাষ্ট্র গভীরভাবে মানবকেন্দ্রিক। আমরা এমনভাবেই ভাবতে শিখেছি। সমাজ মানে মানুষ, ইতিহাস মানে মানুষের কাজ, আর যুদ্ধ মানে মানুষের সাহস। এই বর্ণনায় প্রাণীদের জায়গা বড়জোর সহায়কের। যন্ত্রের মতো ব্যবহারযোগ্য, প্রয়োজন ‘লজিস্টিক হিসেবে গণ্য। কাজ শেষ হলে সরিয়ে দেওয়া যায়। এই ভাবনাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস এই স্বাভাবিকতাকে প্রশ্ন করে। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে প্রাণীরা বরাবরই কেন্দ্রে ছিল। যুদ্ধহস্তী ছাড়া প্রাচীন ভারতের রাজনীতি কল্পনা করা যায় না। ঘোড়া ছাড়া দিল্লি সুলতানি বা মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল অসম্ভব। কাজেই মরুভূমিতে উট, পাহাড়ে খচ্চর, দুর্গম পথে টাট্টু কেবল বাহন নয়, রাষ্ট্রের শরীর। আজও সেই সত্য বদলায়নি। প্রযুক্তির যুগেও এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে যন্ত্র থেমে যায়, মানুষ ক্লান্ত হয়, কিন্তু প্রাণী এগিয়ে চলে। লাদাখের ঠান্ডা মরুভূমিতে বাখট্রিয়ান উট রসদ বহন করে। সিয়াচেনের বরফে জান্সকারি টাট্টু পথ খুঁজে নেয়। বিস্ফোরক শনাক্ত করতে কুকুরের বিকল্প এখনও নেই। বিমানঘাঁটি রক্ষা করতে বাজপাখি কাজে লাগে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন সীমান্তে প্রাণীরাই অনেক সময় প্রথম সারিতে। তবু এতদিন এই প্রাণীরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ছিল না। কারণ তারা কথা বলে না, দাবি তোলে না, ইতিহাস লেখে না। ‘রিমাউন্ট অ্যান্ড ভেটেরিনারি কর্পস’ এই নীরবতার দীর্ঘ সাক্ষী। এখানেই প্রাণীদের জন্ম, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, আবার কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তারা পাহারা দেয়, উদ্ধার করে, বোঝা টানে, ঝুঁকি নেয়। কখনও কখনও প্রাণও দেয়। কিন্তু এই সেবার ভাষা পরিসংখ্যানের, খুবই শুষ্ক। নথিতে লেখা থাকে কতগুলি প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত, কতগুলি বদলি করা হল। স্মৃতি সেখানে ঢোকে না। তাই গল্প বা গৌরবগাথাও তৈরি হয় না। কারণ যার নাম নেই, তার দামও নেই। ইতিহাস বলে এই অদৃশ্যতাই এক ধরনের সামাজিক দমন। প্রাণীদের কষ্ট স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। এই মনোভাব আমাদের সংস্কৃতির মধ্যেও গভীরভাবে বসে আছে। ভারতীয় সমাজ প্রাণী পূজা করতে জানে। দেবতার বাহন হিসেবে প্রাণী পবিত্র। কখনও দেবতার রূপেই প্রাণী। কিন্তু এই প্রতীকী শ্রদ্ধা খুব কম ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন নৈতিকতায় রূপ নেয়।
সেযুগেও যুদ্ধহস্তী ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, আবার নির্মমভাবে কৌশলের অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়েছে। আজকের দিনেও সাধারণ মানুষের হাতে বন্যপ্রাণী খেপানো বা আকছাড় হত্যা থেমে নেই। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি ২০২০ সালে কেরলের পলাক্কাড জেলায় সাইলেন্ট ভ্যালির কাছে সেই গর্ভবতী হাতিটির মৃত্যু। খাবারের সঙ্গে বিস্ফোরক মিশিয়ে দেওয়া হয়। তারপর তা ফেটে গিয়ে দীর্ঘ যন্ত্রণার পর সে নদীর জলে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছিল। এই বীভৎস স্মৃতি আজও অস্বস্তিকরভাবে আমাদের সঙ্গে রয়ে গিয়েছে। একইভাবে অন্যান্য প্রাণী, যেমন কুকুর পৌরাণিক রক্ষক, ভৈরবের বাহন, অথচ শহরের রাস্তায় অবাঞ্ছিত। গোরু মা, অথচ দুধ বন্ধ হলে রাস্তার ধারে অনাহারে।
পূজা এখানে দায়িত্বের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রও এই দ্বৈততার বাইরে নয়। প্রতীকের ভাষা একরকম, ব্যবহারের বাস্তবতা আরেক। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রাণীদের হাঁটা নিছক সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যে নয়। বরং এক ধরনের স্বীকারোক্তি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল দেশীয় প্রাণী প্রজাতির উপস্থিতি। আত্মনির্ভর ভারতের কথা বলতে গিয়ে আমরা প্রায়শই কারখানা, প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদনের কথা ভাবি। কিন্তু জান্সকারি টাট্টু, মুধোল হাউন্ড, রাজাপালায়ম কোনও আধুনিক উদ্ভাবন নয়। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ ও ভূপ্রকৃতির সহবাসের ফল। তাদের স্বীকৃতি মানে আত্মনির্ভরতাকে প্রকৃতির সঙ্গেও যুক্ত করা। এই স্বীকৃতি কোনও বিপ্লব নয়। এতে প্রাণীরা নাগরিক হয়ে যায় না। তাদের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্র নতুন করে ভাবে, এমন দাবিও নেই। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়— ‘দেখা যাওয়া’। অদৃশ্য থাকা মানে ইতিহাসের বাইরে থাকা। সাধারণতন্ত্র দিবস বরাবরই রাষ্ট্রের আয়না। সেখানে যা দেখা যায়, তা রাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে বলতে চায়। ২০২৬ সালে সেই আয়নায় প্রাণীদের উপস্থিতি আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি করবে! এই সাধারণতন্ত্র কেবল মানুষের হাতে গড়া নয়। বহুদিন ধরে বহু প্রজাতির শরীর, শ্রম ও নীরবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে এই রাষ্ট্র। যেদিন উট, টাট্টু আর কুকুর কর্তব্য পথে হাঁটবে সেদিন তারা শুধুমাত্র কুচকাওয়াজের অংশ হবে না। বরং আমাদের মনে করিয়ে দেবে কতদিন ধরে আমরা তাদের উপর ভর করেই রাষ্ট্র বানিয়েছি, অথচ ইতিহাসে তাদের জায়গা দিইনি। এতদিন গল্পটা ছিল একক প্রজাতির। এবার অন্তত সেই গল্পে অন্যদের ছায়া পড়ল। এই ছায়াই হয়তো সাধারণতন্ত্রের পরিণত হওয়ার অন্যতম লক্ষণ।
লেখক বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, মতামত ব্যক্তিগত