নিজস্ব প্রতিনিধি, কাঁকসা: গভীর জঙ্গলে তন্ত্রসাধনা করতেন এক তান্ত্রিক। এক বালককে মা দুর্গার কাছে উৎসর্গ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বাধা দেন কবি জয়দেব। সেই তান্ত্রিককে নিরস্ত করতে ভক্ত জয়দেবের আহ্বানে মা দুর্গা কৃষ্ণরূপে দেখা দেন। সেই থেকে কবি মায়ের নামকরণ করেন শ্যামরূপা। যদিও অপভ্রংশ হয়ে অনেকই শ্যামারূপা বলে ডাকেন। কথিত আছে রাজা লক্ষ্মণ সেন এখানে প্রথম মা দুর্গার পুজো শুরু করেন। এখানে বড় সাধক হিসেবে নাম রয়েছে গোপভূমের সামন্ত রাজা ইছাই ঘোষের। যুদ্ধে ইছাই ঘোষের মৃত্যুর পর তাঁর পালিত কন্যা কাশীপুর রাজার স্ত্রী মা দুর্গাকে নদী পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন কাশীপুর। নদীপথে বরাকরের কাছে মা অধিষ্ঠান নেন। নাম হয় মা কল্যাণেশ্বরী।
দক্ষিণবঙ্গে ইতিহাসের সঙ্গে ব্যাপক ভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই শ্যামরূপা মন্দির। কিন্তু বছর দশেক আগেও তা ছিল গভীর গড় জঙ্গলে মধ্যে থাকা এক ছোট্ট মন্দির। যেখানে দিনের বেলাতেও মানুষ যেতে ভয় পেতেন। রাস্তাঘাট তো দূরের কথা, আলো, জলের ব্যবস্থাটুকু ছিল না। সেই জঙ্গলে ঘেরা নির্জন মন্দির চত্বরই এখন সর্বক্ষণ গমগম করে। বর্ষাতেও জঙ্গলে ঘেরা সেই মন্দিরে ভক্তের ঢল নামছে।
মন্দির চত্বরের ও তাঁর সংলগ্ন এলাকার এই পরিবর্তন দেখে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না ডিএসপির শ্রমিক তরুণকুমার দে। তিনি বলেন, ২০ বছর পর স্ত্রীকে নিয়ে এখানে এলাম, চিনতে পারছি না। তখন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সংকীর্ণ মোরামের রাস্তা দিয়ে বহু কষ্ট করে আসতে হয়েছিল। জল, আলো কিছু ছিল না। তাঁর স্ত্রী টিঙ্কু দে বলেন, আজ আমাদের ২৬তম বিবাহবার্ষিকীতে এটি বড় পাওনা। প্রথমবার যখন এসেছিলাম ভয়ই পেয়েছিলাম। আর এমুখো হইনি। ইসিএলের আধিকারিক স্বামীর সঙ্গে গাড়ি করে এসেছিলেন দোলা কুণ্ডু। তিনি বলেন, আগে শুনতাম এখানে আসা খুবই কঠিন। এখন তো দেখছি ভালো রাস্তা হচ্ছে। মাঝে মধ্যেই প্রকৃতির কালে থাকা মন্দিরে আসাই যায়।
শ্যামরূপা মন্দির সত্যিই প্রকৃতির সিদ্ধপীঠ হয়ে ওঠেছে। জঙ্গল ঘেরা মুচিপাড়া-জয়দেব মূল রাস্তার থেকে ছ’ কিলোমিটার ভেতরে এই মন্দির। পুরো রাস্তাটি গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। বর্ষায় জঙ্গল আরও ঘন হয়েছে। সবুজ পাতার সেই রূপ অনবদ্য। এই মন্দিরের অদূরে রয়েছে আরেক পর্যটন স্থান দেউল। বনদপ্তরের অধিনে থাকা এলাকায় চাইলেও উন্নয়ন করা কঠিন। পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারের উদ্যোগে বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন মেলায় তৈরি হয়েছে রাস্তা। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দু’টি রাস্তা তৈরি হচ্ছে। মূল রাস্তা থেকে একটি রাস্তা এসেছে শ্যামরূপা মন্দিরে অন্য রাস্তাটি মন্দির থেকে দেউল পর্যন্ত। মোট ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে পেভার ব্লক দিয়ে রাস্তা তৈরি হচ্ছে জোরকদমে। কাঁকসা ব্লকের অধীনে এই এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে পঞ্চায়েত সমিতিও। জয়দেব মুচিপাড়া রাস্তার উপর ১৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হবে শ্যামরূপা তোরণ। যাতে মানুষের মধ্যে মন্দিরের আকর্ষণ আরও বাড়ে। প্রদীপ মজুমদার বলেন, ২০১৬ সালে এই এলাকায় প্রথমবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে মায়ের সামনে কথা দিয়েছিলাম, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করব। তা করেছি। এবার রাস্তা নির্মাণ শুরু হয়েছে। মন্দিরের সেবাইত সন্তোষ রায় বলেন, মন্দিরে ভক্ত সমাগম কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।
-নিজস্ব চিত্র