সংবাদদাতা, তারকেশ্বর: ধর্মের ভিত্তিতে জনবিন্যাসকে সামনে রেখে দেশভাগের সমর্থনে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সুচারু যুক্তি খণ্ডন করতে পারেননি দেশের তৎকালীন নেতৃত্ব। সেই বক্তব্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন জিন্নারাও। গোটা পাঞ্জাবকে পশ্চিম পাকিস্তানে এবং সমগ্র বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল নিয়েছিল পাকপন্থীরা। এখানেই বেঁকে বসেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।
তারকেশ্বরের বাসিন্দা তালপুর পাঠশালার প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নিত্যানন্দ সেনাপতির লেখা একটি বইয়ে দেশভাগ ও ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সব অংশের মানুষকে নিয়ে তারকেশ্বরে একটি আলোচনা সভা আহ্বান করেছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিকে কোনোমতেই সমর্থন দেওয়া হবে না। ত্যাগ যদি করতেই হয়, তাহলে বাংলাদেশ ও পাঞ্জাবের যে অংশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই অঞ্চল পাকিস্তানকে দিয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আলোচনাসভায় সমবেত নেতৃবৃন্দ এই প্রস্তাবকেই সমর্থন জানান।
স্থির হয়, ভারত ভাগ করতে ইংল্যান্ড থেকে আসা প্রতিনিধি মিঃ র্যাড ক্লিফের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালানো হবে। অবিভক্ত ভারতের তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন যখন ভারত ভাগ করার প্রস্তাব দেন, তখন গোটা বাংলা এবং পাঞ্জাবকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জিন্না ও মুসলিম লিগ দাবি তোলে। জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধীর মতো কংগ্রেসের তদানীন্তন নেতারা জিন্নার দাবির কাছে কার্যত আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তখন গর্জে উঠেছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বলেছিলেন, পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিম পাঞ্জাব মুসলিম প্রধান, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব পাঞ্জাব হিন্দু প্রধান অঞ্চল। সুতরাং দুই হিন্দু প্রধান অঞ্চলকে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেদিন তাঁর গণআন্দোলন, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও অকাট্য যুক্তি উপেক্ষা করতে পারেননি কেউ। বরং বলা ভালো, সকলেই তাঁর সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। জিন্নার লোভ ছিল কলকাতার উপর। কারণ তখন কলকাতাই ছিল সারা ভারতের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র। তাই সমগ্র বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তি সাজিয়েছিলেন জিন্না। ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রের যে সীমানার উল্লেখ রয়েছে, তা এক অর্থে শ্যামাপ্রসাদেরই অবদান। পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গ নামে দু’টি রাজ্য বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় না থাকলে এই দু’টি রাজ্যের অস্তিত্বই থাকত না।
সেই সময় একাধিক পত্রিকায় বাংলা বিভাজনের বাস্তব ঘটনা উঠে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি পাঞ্জাব প্রদেশ তৈরির মূল ভিত স্থাপন হয়েছিল তারকেশ্বর থেকেই। এই দিনটিকে স্মরণ করতে আগামী ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করতে তারকেশ্বরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। জোরকদমে চলছে তার প্রস্তুতি।