নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি: এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, সঙ্গে নগদ ২০-২৫ হাজার টাকা। নেপাল সীমান্তের সাইবার ক্যাফেতে ফেললেই মিলত ভারতীয় নাগরিকত্বের অন্যতম প্রমাণপত্র ‘আধার কার্ড’। টানা তিন দিন ধরে ‘চিকেন নেক’ শিলিগুড়িতে জাল আধার কার্ড চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে এমন তথ্য পেয়েছে দার্জিলিং জেলা পুলিস। বিষয়টি তাদের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়েছে। তাদের সন্দেহ, সংশ্লিষ্ট চক্রের নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। যার ঘাঁটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও নেপালে। সংশ্লিষ্ট চক্রের শিকড় উৎখাত করতে জোরদার তদন্তে নেমেছে পুলিস। ইতিমধ্যে এসডিপিও (নকশালবাড়ি) নেহা জৈনের নেতৃত্বে ঘটনার তদন্ত চলছে। দার্জিলিংয়ের পুলিস সুপার প্রবীণ প্রকাশ বলেন, জাল আধার কার্ড কাণ্ডে ধৃতের সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত বলে মনে হচ্ছে। এনিয়ে এসডিপিও তদন্ত করছেন। সমস্ত দিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান চালিয়ে গত শুক্রবার খড়িবাড়ির নেপাল সীমান্তবর্তী বাতাসিতে জাল আধার কার্ড তৈরি চক্রের হদিশ পায় পুলিস। তারা চক্রের পান্ডা সোনাই সরকারকে গ্রেপ্তার করে। পুলিস ও গোয়েন্দা সূত্রে খবর, বাংলাদেশ কিংবা নেপাল থেকে চোরাপথে অনেকেই আসছে শিলিগুড়িতে। ওই অনুপ্রবেশকরীদের আধার কার্ড তৈরি করে দেওয়া হতো বাতাসির ওই সাইবার ক্যাফেতে। এজন্য অনুপ্রবেশকারীদের শুধুমাত্র এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং নগদ ২৫ হাজার টাকা দিতে হতো। ছবি ও টাকা ফেলার কয়েক মিনিটের মধ্যে সরকারি লোগো, অফিসারের স্বাক্ষর সহ জাল আধার কার্ড পেয়ে যেত অনুপ্রবেশকারীরা। একই সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের রেসিডেনশিয়াল ও জন্মের সার্টিফিকেটও দেওয়া হতো। এসব নথি নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের কেউ এখানে বসবাস করছে। আস্তে আস্তে তারা রেশনকার্ড, ভোটারকার্ড বের করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ। আবার কেউ কেউ ওই জাল আধার কার্ডের সহায়তায় পাসপোর্ট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ। এনিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিচ্ছে। পুলিস অফিসাররা বলেন, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্মার্টফোন সহ আধুনিক কিছু সরঞ্জামের সাহায্যে জাল নথিগুলি তৈরি করত ধৃত। এমনকী, ধৃতের ডেরায় বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল অনুপ্রবেশকারীদের। সেখানে তাদের ছবি তুলে দেওয়া হতো। তিন দিন ধরে ঘটনার তদন্ত চালিয়ে গোয়েন্দারা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপালে ঘাঁটি গেড়ে থাকা ‘ধুরপাটি’ বা এজেন্টের সঙ্গে জলপাইগুড়ি ও উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ার কিছু এজেন্টের যোগাযোগ রয়েছে। যারা বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে চোরাপথে এখানে নিয়ে আসে অনুপ্রবেশকারীদের। ওই এজেন্টদের মাধ্যমেই বাতাসির ক্যাফেতে অনুপ্রবেশকারীরা পৌঁছত। স্বভাবতই ধৃতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এধরনের কিছু সাইবার ক্যাফে উত্তরবঙ্গে সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে বলে সন্দেহ। পুলিস অফিসাররা বলেন, সমগ্র বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে, শুধু জাল আধার কার্ড নয়, ‘চিকেন নেকে’ জাল পাসপোর্ট, মাদক, আগ্নেয়াস্ত্রের কারবার দীর্ঘদিন ধরে রমরমা। নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) স্থায়ী অফিস চালুর দাবি উঠেছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, একদা প্রধাননগরে অফিস চালু করেছিল এনআইএ। পরবর্তীতে সেই অফিস কখনও পিনটেল ভিলেজ, আবার কখনও পরিবহণ নগরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এখানে এনআইএ’র স্থায়ী অফিস নেই। বর্তমানে কলকাতা থেকে তারা এখানে নজরদারি চালাচ্ছে।



