রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: দু’জনেরই বেড়ে ওঠা স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারে। বাংলায় কংগ্রেস ভাগ হওয়ার আগে থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি একটা ‘সফট কর্নার’ ছিল। পরে তৃণমূলের সুপ্রিমো হিসেবে তাঁর লড়াই দেখেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হতেই কালীঘাটে পুজোও দিয়েছেন। পারিবারিক রাজনীতির সূত্রে মমতার অনেক কাছাকাছিও এসেছেন। সৌজন্যে ভাই শিশির অধিকারী। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে রাজনীতির রং বদলেছে শশাঙ্কশেখর অধিকারীর শৈশবের লালনভূমি কাঁথিতে। কিন্তু, মেদিনীপুর শহরে বসে আজও সেই মমতার নামে আবেগঘন শশাঙ্কশেখরবাবু ও তাঁর স্ত্রী চঞ্চললতা অধিকারী। দু’জনের অভিমান একটাই—‘আগে আমাদের খোঁজখবর নিতেন উনি। এখন আর নেন না!’
অবিভক্ত মেদিনীপুরের রাজনীতিতে শিশিরবাবু ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত। কংগ্রেসের ডাকবুকো নেতা। তৃণমূলের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই ঘাসফুল পরিবারের সদস্য। হয়েছেন সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও। সেই শিশিরবাবুর মেজদা হলেন শশাঙ্কশেখরবাবু। অর্থাৎ, কাঁথির অধিকারী পরিবারের মেজকর্তা। কোনওদিন সরাসরি রাজনীতি করেননি। সরকারি চাকরির সূত্রে তিনি চলে এসেছিলেন মেদিনীপুরে। এখন শহরের পাটনা বাজার এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। চার মেয়ে ও নাতি-নাতনিকে নিয়ে ভরা সংসার। শনিবার দুপুরে এক ঘরোয়া আড্ডায় পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, শিশিরবাবুরা ছয় ভাই ও দুই বোন। সবাই একসঙ্গে খেলাধুলো করে বড় হয়েছেন। শিরা-উপশিরায় আদি কংগ্রেসি রক্ত। পরে ভাই শিশিরবাবু তৃণমূলে চলে এলে শশাঙ্কবাবুরাও মমতার শুভাকাঙ্খী হয়ে ওঠেন। সেই থেকে আজও মমতার নাম শুনলে আবেগঘন হয়ে পড়েন বৃদ্ধ দম্পতি।
বাড়ির বারান্দায় চেয়ারে বসেছিলেন শশাঙ্কশেখরবাবু ও চঞ্চললতা। বয়সের ভারে দু’জনেই খুব ধীরে ধীরে কথা বলেন। ‘চঞ্চললতাদেবী বলছিলেন, ‘আমি স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারে বড় হয়েছি। দাদা ছিলেন কংগ্রেসের লিডার। ফলে, মমতা ভোটে দাঁড়ানোর অনেক আগে থেকেই ওকে ভালোবাসি।’ পরে দেওর শিশিরবাবুর রাজনৈতিক উত্থানের সূত্রে মমতাকে অনেক কাছাকাছি দেখার সুযোগ হয়েছে। মমতাও একসময় শশাঙ্কবাবুদের খোঁজখবর নিতেন। চঞ্চললতা দেবীর কথায়, ‘মমতা যখন মুখ্যমন্ত্রী হলেন তখন ওঁর নামে কালীঘাটে পুজোও দিয়েছি। এখন আর খোঁজ নেন না।’
চঞ্চললতাদেবীর বয়স এখন তিরাশি। শশাঙ্কশেখরববাবুর বেশ কয়েকবছর বেশি। নিয়ম করে দু’জনে খবরের কাগজ পড়েন। রাজনৈতিক খবরের তাঁদের বেশি টানে। চঞ্চললতাদেবী বলছিলেন, ‘একসময় খুব কষ্ট করে সংসার দাঁড় করিয়েছি। রাজনীতি খুব ভালোবাসি। এবার বাড়িতে বসেই ভোট দেব। তবে, আমাদের সঙ্গে সব দলেরই সম্পর্ক ভালো।’
শশাঙ্কশেখরবাবুর বাড়িতে তিন প্রজন্মের বাস। তবে, রাজনীতিতে তিনটি পৃথক মতাদর্শের সন্নিবেশ। বৃদ্ধ দম্পত্তি আদি কংগ্রেসি ঘরানার। নাতনিদের মধ্যে একজন সোনালী লালা। এদিন ঘরোয়া আড্ডায় তিনিও ছিলেন। বিয়ে হয়েছে কাঁথিতে। কথায় কথায় তিনি বলছিলেন, ‘আমরা কিন্তু পরিবর্তনের পক্ষে। বিজেপি এলে ভালোই হবে। তবে, এটাও মনে রাখতে হবে নতুন জেনারেশন অবশ্য সিপিএমকে পছন্দ করছে। এবারও বামেদের ভোট বাড়বে। এই দেখুন না, আমার ছেলে বলে সিপিএম ভালো। এবার বিজেপি ক্ষমতায় এলে পাঁচ কিংবা দশ বছর পর ফের বাংলার কুর্সিতে বসবে বামেরা।’
অতীতের আবেগ, বর্তমানের আক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—বঙ্গ রাজনীতিতে এই তিন ভাবনার দোলাচলে অধিকারীদের মেজো কর্তার পরিবারে। শশাঙ্কশেখর অধিকারী ও চঞ্চললতা অধিকারী।