সংবাদদাতা, কাটোয়া: রাঢ়বাংলার প্রাচীন লোকশিল্প বোলান গান। বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ এই বিলুপ্তপ্রায় বোলান গানের চর্চা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন কিছু খেটে খাওয়া মানুষ। এমনই একজন কাটোয়ার মুস্থল গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসুদেব ঘোষ। ৩০বছরের বেশি সময় বোলানের পালা লিখেই কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। হাজার হাজার পালা রচনা করে জেলার লোকশিল্পের প্রসার ঘটিয়েছেন। চৈত্র সংক্রান্তির সময় বোলান গান নিতে রাতদিন তাঁর বাড়িতে নানা জেলার শিল্পীরা ভিড় করেন। কিন্তু এখনও তিনি কোনও সম্মান পাননি।
‘বোল’ ধাতু থেকেই বোলান শব্দটি এসেছে। লোকসমাজে যা নিত্যদিন ঘটে, তা নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক গান বেঁধে সমাজকে শিক্ষা দেওয়াই বোলান গান। নানা সাজে সজ্জিত হয়ে বোলান গান গেয়ে শিল্পীরা গ্রামাঞ্চলের মানুষের মনোরঞ্জন করেন। এখন বোলান গানের প্রচলন কমে গিয়েছে। তবে নবীন প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে নিত্যনতুন গান বাঁধা হচ্ছে।
বাসুদেব ঘোষ ছোটবেলা থেকে এখনও অবধি প্রায় তিনহাজার বোলান গান বেঁধেছেন। অজস্র পাঁচালি তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। এখন প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বোলান গান নিতে শিল্পীরা তাঁর কাছে আসেন। পোড় বোলান, রঙ পাঁচালি, সখী নাচ, দাঁড় বোলান, শ্মশান বোলান, তর্জা, পালা বোলান তিনি লেখেন। বাসুদেববাবু বলেন, আগে ধর্মীয় সুরে বোলান লেখা হতো। এখন সেসব সুরে বোলান কেউ শোনে না। তাই সিনেমার গানের সুরেই বোলান লিখতে হয়। আসলে যুগ বদলেছে। মানুষের রুচি বদলেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের মতো করে না পৌঁছতে পারলে এই গান কেউ শুনবে না। আগে বছরে ১২৫টি পালা লিখতাম। এখন বছরে ৩৫-৪০টি পালা লেখা হয়৷ এক-একটি পালায় তিন-চারটি করে পাঁচালি দিতে হয়। সংক্রান্তির সময় গ্রামবাংলায় বোলান গানের কদর এখনও আছে।
আগে তাঁত বুনতেন বাসুদেববাবু। এখন শুধু বোলান লেখাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। জীবনে একটাই খেদ, সরকারি ভাতা ছাড়া ন্যূনতম সম্মান পাননি। তিনি বলেন, অন্তত বিলুপ্ত হতে বসা গান যদি সংগ্রহ করে বই আকারে বের হতো, তাহলে বোলান চর্চা বাড়ত। কিন্তু সেটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। বোলান গান নিয়ে চর্চা করেন পেশায় শিক্ষক ডঃ তুষার পণ্ডিত। তিনি বলেন, বাসুদেববাবু সারা জীবনই বোলান লিখে কাটিয়ে দিলেন। তাঁর যোগ্য সম্মান বা মূল্যায়ন হল না। কেতুগ্রামের বোলান শিল্পী সুজন মাঝি, উদয় মাঝি বলেন, গ্রামে গ্রামে গাজন উৎসব শুরু হতেই বোলান গাইতে বের হই। এখন তেমন শ্রোতা মেলে না। যে দু’পয়সা আয় হয়, তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের উৎসবে নতুন জামাকাপড় কিনে দিই। এটাই আমাদের আনন্দ। -নিজস্ব চিত্র