কাজলকান্তি কর্মকার , ঘাটাল: বিগত দু’ মাসের মধ্যে ঘাটাল মহকুমায় সাতজন মাধ্যমিক পড়ুয়ার আত্মহত্যা করেছে। একের পর এক পড়ুয়ার আত্মহত্যায় উদ্বিগ্ন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকরা। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই সাতজনের মধ্যে কেউ মাধ্যমিক দিয়েছিল আবার কারও আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা ছিল। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে মহকুমা পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে। পুলিসের এক আধিকারিক বলেন, বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগের। কয়েকটি ঘটনায় সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা জানা গেলেও বাকিদের মৃত্যুর পিছনে কোনও কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
মহকুমার তিনটি থানার পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ৪ জুলাই ঘাটাল থানার অমরপুরের অম্বিকা মালিকের (১৬) ঝুলন্ত দেহ তার বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয়। সে ওই থানারই আলুই হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এর ঠিক কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ২২ জুন ওই থানারই ইসলামপুর গ্ৰামের আরও এক ছাত্রী গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। দিয়া সামন্ত (১৬) নামের ওই ছাত্রী লছিপুর বীণাপাণি হাইস্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ত। আলুই হাইস্কুলের দশম শ্রেণির আরও এক ছাত্রী বছর ষোলোর বর্ষা মণ্ডলও ৪ জুন একইভাবে আত্মহত্যা করে। ঘাটালের শ্যামপুরে বাড়ি তার। ১৬ মে দাসপুর দাদপুর হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রীও গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারা যায়। ওই নাবালিকার নাম রিয়াঙ্কা ধাওড়ি (১৬)। ২ মে ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল। ফলাফল ঘোষণা হওয়ার আগেই ঘাটাল থানার খড়ার গোপীনাথপুরের রীতম ঘোষের (১৬) ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিস। প্রত্যাশিত ফলাফল না হওয়ার জন্যই হয়তো রীতম নিজেকে শেষ করে দিয়েছিল বলে পুলিসের অনুমান। খড়ার শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামন্দির থেকে সে মাধ্যমিক দিয়েছিল। ওই থানারই দলপতিপুরে সালেমা পারভিন নামে বছর আঠারোর এক পড়ুয়াও নিজেকে একইভাবে শেষ করে দেয় ২৭ এপ্রিল। তার ঠিক দিন দশেক আগে ১৭ এপ্রিল দাসপুর থানার বরুণা সৎসঙ্গ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র সমর রুইদাস (১৬) ঘাস মারা বিষ খেয়ে মারা যায় ওইদিন। ১৫ এপ্রিল সে বিষপান করেছিল। ডিঁয়াল নহলা চাঁইপাটে তার বাড়ি।
দাসপুর-২ ব্লকের সোনাখালি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মালবিকা পাল, দাসপুর-১ ব্লকের সাগরপুর স্যার আশুতোষ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মানসকুমার মান্না বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে এতজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর মৃত্যু ভাবিয়ে তুলেছে শিক্ষক মহলকে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা মনে করছেন, এর মূল কারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতের স্মার্ট ফোন। ফোনের মাধ্যমে প্রেম এবং তার পরিণতি মৃত্যু। তবে পরিবারও এক্ষেত্রে অনেকটাই দায়ী। সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়েরা আর আগের মতো নজর দিচ্ছেন না। ফোন নিয়ে সন্তানরা কী করছে না করছে, তার খবর রাখছেন না। মালবিকাদেবী বলেন, সন্তানদের সঙ্গে বাবা বা মায়ের নিবিড় সম্পর্ক থাকলে সন্তানরা তাদের মানসিক অবসাদের কথা অভিভাবকদের বলতে দ্বিধা করে না। সেক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ঘটনার সম্ভাবনা কমে।
এনিয়ে কলকাতার এক মনরোগ বিশেষজ্ঞ অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায় বলেন, স্কুলে নিয়মিত কাউন্সেলিং চালু করা জরুরি। অভিভাবকদের সচেতন করতে বিশেষ কর্মশালা প্রয়োজন। সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য লাইফ স্কিল এডুকেশন চালু করতে হবে। যাতে তারা মানসিক চাপ, সম্পর্ক, সাফল্য, ব্যর্থতা ইত্যাদি সামলাতে শেখে। ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রয়োজন। একেবারে নিষেধ নয়, বরং গঠনমূলক বিকল্প দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে থাকে না বলা অনেক কথা। সময়মতো কথা বললে হয়তো ওই সব পড়ুয়ারা বেঁচে যেত! তাই মন খারাপের লক্ষণ দেখলে পরিবার এবং স্কুলের গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়া উচিত।