নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: শতাব্দী প্রাচীন দশভুজার পুজো মানেই ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা চমকের সম্ভার। কালে কালে তাতে জনশ্রুতির বাহার জুড়ে গিয়ে হয়েছে আরও চমকপ্রদ। কিন্তু তা বলে মনসার নির্দেশে দুর্গার পুজো? লৌকিক জগতে এমন অলৌকিকও যে হয় হুগলির সেনবাড়ির পুজো তারই সাক্ষ্য বহন করছে। এটি কার্যত বেনজির এক পুজো। প্রায় ৩২১ বছর ধরে হচ্ছে গঙ্গাপাড়ের জিরাটে, সেনবাড়িতে। কালের গতিকে বণিক পরিবারের সে আড়ম্বর বিদায় নিয়েছে। সোনালী অতীত টিকিয়ে রেখেছে কিছু পুরনো দালান, খিলান আর সাবেক নির্মাণশৈলীর ছেঁড়া ছেঁড়া কাঠামো। তাকেই সাক্ষী রেখে মণ্ডপ বেঁধে এখনও পুজো হয়। নিভু নিভু বেলজিয়াম ঝাড়ে ঐতিহ্য আর নিষ্ঠা জ্বলজ্বল করে, দশভুজার ত্রিনয়নের মতো।
মনসা থেকে দুর্গা যেমন আছে, তেমনই দেবপুজোর বাধ্যতামূলক শর্তও আছে। আছে স্বপ্নাদেশ। আর আছে ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজঃ’ বিষয়ের মতো একটি বাক্য। ৩২১ বছর ধরে বইছে তার স্রোত। সেনবংশজরা জানিয়েছেন, দেবী মনসা স্বপ্নাদেশে তাঁদের পূর্বপুরুষদের বলেছিলেন, তাঁর দিদি-বোনদেরও পুজো করতে হবে। তারপরই মনসা ভক্ত সেনদের দেবদেউলে দশভুজার চোখ ধাঁধানো পুজো শুরু হয়। পুরাণ এমনিতেই মনসাকে নিয়ে দ্বিধাবিড়ম্বিত। মনসার ভাইদের হদিশ মিললেও পৌরাণিক আখ্যান, মঙ্গলকাব্য হাতড়ে অন্তত সর্পদেবীর বোন, দিদির হদিশ খুঁজে বের করা এখনও পর্যন্ত অসম্ভব। মজা হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে সেনবাড়ির পূর্বজরা মনসার ‘দিদি-বোন’ হিসেবে দুর্গা-লক্ষ্মীকে কেন উপাস্য হিসেবে ধরলেন, সে ইতিহাস অমিল। জনশ্রুতিও এই পর্বে নীরব। তবে স্বপ্নাদেশের সেই ঊষাকাল থেকেই মনসা মণ্ডপে পুজো পেয়ে আসছেন দেবী দশভুজা, সপরিবারে। বহুবছর আগে সেনবাড়িতে বিয়ে হয় লক্ষ্মী সেনের। বর্তমান সময় পুজো আয়োজনের অন্যতম কর্ত্রী বলেন, ‘দেবতার পুজো নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন কখনই কেউ তোলেনি। আমিও পারিবারিক ঐতিহ্য, নিয়ম, নিষ্ঠার সঙ্গে সেসব আজও মেনে চলেছি। মনসা ও দেবী দুর্গার মধ্যে পৌরাণিক বা মঙ্গলকাব্যিক যোগ-বিয়োগ নিয়ে গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন যেখানে গণমঙ্গলের, সেখানে পুজোটাই মুখ্য।’
লোকশ্রুতি অনুযায়ী অলৌকিক স্বপ্নাদেশ কি ছিল? জানা গিয়েছে, অতীতে গঙ্গা সেনবাড়ির লাগোয়া খাত ধরে বইত। সেখানেই প্রতিদিন স্নানে যেতেন ধনবান বণিক অশ্বিনী সেন। প্রায় ৩২১ বছর আগে সেখানেই তিনি শিলাখণ্ড পেয়েছিলেন। আর রাতে মনসার স্বপ্নাদেশ মিলেছিল পুজো শুরু করার। মন্দির গড়ে সর্পদেবীর আরাধনা চলছিল ভালোই। কিন্তু আবারও মিলল মনসার স্বপ্নাদেশ। ‘আমার দিদি-বোনদের পুজোও করতে হবে’-সেই শুরু সেনবাড়ির দুর্গাপুজোর। এসব কথা ১১১০ বঙ্গাব্দের। কাল তার নিজস্ব পথে তারপরে এগিয়েছে অনেক পথ। গঙ্গা সরে গিয়েছে সাবেক পথ ছেড়ে। কিন্তু মনসার নির্দেশে দেশের একমাত্র দশভুজা আরাধনার আশ্রয়স্থল হয়ে রয়ে গিয়েছে জিরাটের সেনেদের পুজো। আজ ভক্তির শক্তিতেই ভাঙা দেউল ঢাকতে আধুনিক মণ্ডপসজ্জার আয়োজন হয়। জৌলুসের স্থান নেয় কঠিন রীতি আর বৈদিক গাম্ভীর্য। পল্লবিত হয় বিরল পুজোর জনশ্রুতি। সাবেক জলজঙ্গলের জনপদে স্থাণু হয়ে থাকে মনসা-দুর্গার অভাবনীয় মিলনের বেনজির আখ্যান। নিজস্ব চিত্র