Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তেন বিক্রেতারাই

মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তেন বিক্রেতারাই
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

গণেশ মজুমদার, কালনা: পয়লা বৈশাখে হালখাতার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। তবে অতীতের হালখাতার সঙ্গে বর্তমানের হালখাতার বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে প্রবীণরা মনে করেন। সেইসময় ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দেবদারু পাতা ও নানা ধরনের ফুল, গ্যাসের বাতি ও ডে লাইটের ঝাড়-লন্ঠন দিয়ে সাজানো হতো প্রতিষ্ঠান। খদ্দেরকে বসিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে মিষ্টিমুখ করানো হতো। পদ্মপাতায় মোড়া ও মাটির ঠুকরিতে দেওয়া হতো নানা পদের মিষ্টি। এখন জাঁকজমক বাড়লেও অনেকাংশে হারিয়েছে আন্তরিকতা। এমনই দাবি প্রবীণদের। মিষ্টির রেওয়াজ ভেঙে প্যাকেটে জায়গা পাচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক মোড়কের খাবার। কার্ডের আমন্ত্রণ পত্রের বদলে মোবাইলে ম্যাসেজ ও হোয়াটসঅ্যাপে আমন্ত্রণপত্র পৌছে দেওয়া হচ্ছে। 

Advertisement

ভাগীরথী নদীকেন্দ্রীক কালনা শহর প্রাচীন ব্যবসায়িক কেন্দ্র। দেড়শো বছরের পুরসভা। শহরের দুই শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসে মহিষমর্দ্দিনীতলার ভাগীরথী নদীঘাট, হপ্তাঘাট, পাথুরিয়া মহল ঘাটে নদীপথে ভিড়ত বাণিজ্যিক হোরমিলার কোম্পানির স্টিমার, বড় নৌকা ও বজরা। স্টিমার, বজরা ও নৌকায় আসত নানা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ফেরার পথে নিয়ে যেত এলাকার উৎপাদিত পণ্য। মাল নামানো ও ওঠানোর জন্য ওড়িশা থেকে আসা শ্রমিকরা কাজ করতেন। ফলে নদীকেন্দ্রীক একাধিক ব্যবসায়িক গোলদারি, বস্ত্র সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বা গদিঘর গড়ে ওঠে। নদীর অনতিদূরে গড়ে ওঠে মহকুমার বৃহত্তম বাণিজ্য কেন্দ্র চকবাজার ও সোনাপট্টি। কালনার আশপাশে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন বেচাকেনা করতে। ধারে ও নগদে হতো লেনদেন। তার জন্য থাকত লাল সুতোয় বাঁধা জাবদা খাতা। তাতেই লেখা থাকত লেনদেনের হিসেব। দেড়শো বছর আগে কালনা শহরে কয়েকটি মাত্র বস্ত্র, গোলদারি, মিষ্টি ও সোনার দোকান ছিল। অনেকে মনে করেন, কালনার ভৌগোলিক অবস্থান ও ব্যবসায়িক টানে বর্ধমানের মহারাজারা কালনা শহরকে ভালোবেসে একাধিক মন্দির তৈরি করেছিলেন।
সেই সময় চৈত্র মাস পড়লেই সুতোয় বাঁধা জাবদা খাতা দেখে খোঁজ পড়ত খদ্দেরদের। হাতে লেখা পয়লা বৈশাখের হালখাতার আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হতো তাঁদের কাছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেদের গদি ঘরে গণেশ পুজো করত। কেউ কেউ আবার কালনার প্রাচীন সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, চকবাজারের আনন্দময়ী মন্দির সহ একাধিক মন্দিরে পুজো দিয়ে নতুন বছরের ব্যবসা শুরু করতেন। মন্দিরগুলিতে ভোর থেকে লম্বা লাইন পড়ত। সকাল থেকে খদ্দেররা হেঁটে বা গোরু-ঘোড়ার গাড়িতে চেপে আসতেন হালখাতায় অংশ নিতে। দোকান ও প্রতিষ্ঠানে নতুন খাতায় নিজের নাম লিখিয়ে ও পাওনা মিটিয়ে সুসম্পর্ক গড়ে মিষ্টিমুখ করতেন। পদ্মপাতা ও মাটির ঠুকরি বোঝাই করে নিয়ে যেতেন কালনার প্রসিদ্ধ মিহিদানা, নোড়া পান্তুয়া, রসগোল্লা সহ নানা মিষ্টি। কয়েকটি নাম করা প্রতিষ্ঠান আবার পয়লা বৈশাখের আগে ভিয়েন বসিয়ে নানা পদের মিষ্টি তৈরি করে খদ্দেরকে খাওয়াত।
কালনার সত্তোরোর্ধ্ব বাসিন্দা অমিয়প্রসাদ সিংহরায় বলেন, সেইসময় কালনা শহরই ছিল মহকুমার একমাত্র বৃহত্তম বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথে নৌকা ও স্থলপথে গোরু-ঘোড়ার গাড়িতে গ্রাম থেকে লোকজন আসতেন। গ্যাস ও হ্যাজা঩কের আলোর বাতি দিয়ে দোকান সাজানো হতো। ছোটবেলায় বাবা-দাদুর হাত ধরে যেতাম। দোকান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ঢুকলেই আতর ছেটানো হতো। নারকেলের নাড়ু, মিহিদানা ও রসগোল্লার সঙ্গে দিত শরবত। ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। আজ বয়সের কারণে খুব বেশি বের হতে পারি না। তবে পয়লা বৈশাখ এলেই সেইসব স্মৃতি মনে পড়ে। আগের থেকে হালখাতার জৌলুস বাড়লেও আন্তরিকতা অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। এখন ধারে কেনাকাটাও কমে গিয়েছে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ