


অর্ক দে, কলকাতা; রবীন্দ্র সরোবরের ৮ নম্বর গেট। এখানে রাস্তার মাঝখানে এক ফালি জমি। পথচারী কিংবা গাড়ির যাত্রীদের এখান দিয়ে যেতে হলে এই জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনবদ্য স্থাপত্যে চোখ আটকাতে বাধ্য। এক পলকে মনে হবে যেন, কোনো পাখির অবয়ব। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি পাখি নয়, এ এক সি হর্স বা সামুদ্রিক ঘোড়ার প্রতিকৃতি। রং-বেরঙের প্লাস্টিক বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খেলনা দিয়ে তৈরি এই ‘ফিনিক্স অব দি ওশান’ নজর কাড়ছে সকলের। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ বা বানাচ্ছেন ভিডিয়ো বা রিল। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল এই স্থাপত্য।
১৫ ফুট দীর্ঘ এই স্থাপত্য তৈরিতে হয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের ব্যাগ, প্লাস্টিকের খেলনা, অকেজো বাল্ব, তার, আর মাছ ধরার জাল দিয়ে। মুম্বইয়ের কালাঘোড়া আর্ট ফেস্টিভ্যালের জন্য ২০২৫ সালে বর্জ্যের তৈরি ‘ফিনিক্স’ বানিয়েছিলেন বাঙালি শিল্পী সুকৃত সেন। স্রষ্টা বলেন, ওরা একটি ঘোড়া তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল। আমরা যেহেতু জল নিয়ে কাজ করি, তাই সি হর্স বানানোর কথা বলেছিলাম। সেই সূত্রেই এই স্থাপত্যশৈলী। সুকৃতের কথায়, আমরা মূলত সামুদ্রিক দূষণ বা জল দূষণের উপরে একটা বার্তা দিতে চেষ্টা করেছি। যেভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য জলকে দূষিত করে, সেই ভাবনা থেকেই এই সৃষ্টি।
সুকৃত সেনের ভাবনায় এবং ব্যোম মেহতার কারুকাজে এটি নির্মীত হয়েছে। মুম্বইয়ে আর্ট ফেস্টিভ্যাল হয়ে যাওয়ার পর এই স্থাপত্যকে খুলে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘদিন এটি সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বুলেভার্ডে পড়েছিল। কিন্তু, এভাবে তাঁর ‘সৃষ্টি’কে নষ্ট করতে চাইছিলেন না ‘স্রষ্টা’। কলকাতার বাসিন্দা সুকৃতবাবু স্থানীয় কাউন্সিলার মণীষা বসুর সঙ্গে এব্যাপারে যোগাযোগ করেন। তারপর ‘ইনার হুইল ক্লাব অব সেন্ট্রাল কলকাতা’ এবং বিএসএস স্কুল ও হারাপুর জুনিয়র হাইস্কুলের খুদে পড়ুয়াদের এখানে যুক্ত করা হয়। সুকৃত বলেন, ব্যোমও কলকাতায় এসেছিলেন। সকলে মিলে ফের প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি এই সি হর্সকে রি-স্ট্রাকচার করা হয়। কিন্তু সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে সেটিকে রাখলে সেভাবে কারও নজরে পড়ছিল না। অতঃপর মণীষা বসুর সহযোগিতায় তৎকালীন বিধায়ক দেবাশিস কুমার ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে কথা বলে এটিকে রবীন্দ্র সরোবরে রোয়িং ক্লাবের সামনে ‘ডিসপ্লে’ করা হয়।
এই কাঠামোর বেস তৈরি হয়েছে বাচ্চাদের ফেলে দেওয়া খেলনা দিয়ে। বেসটি প্রায় তিন ফুট উঁচু। তার উপর দাঁড়িয়ে ১৫ ফুটের সি হর্স। সুকৃত বলেন, এখন এই স্থাপত্যকে আরও বেশি মানুষ দেখতে পাচ্ছেন। মানুষকে দূষণ নিয়ে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পুরো স্থাপত্যটিই তৈরি হয়েছে প্লাস্টিকের ব্যাগ, খেলনা অকেজো বাল্ব, ব্যাডমিন্টনের ফেলে দেওয়া র্যাকেট-কক, মাছ ধরার ছেঁড়া জাল ইত্যাদি দিয়ে। তাঁর কথায়, বর্জ্য দিয়ে তৈরি স্থাপত্য কলকাতায় এই প্রথম। এমন আরও সৃষ্টির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি সি হর্স। -নিজস্ব চিত্র