সুপ্রিয় নায়েক: এক অদ্ভুত অসুখ স্ক্রাব টাইফাস। পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে রোগের প্রকোপ। একাধিক অসুখের উপসর্গের সঙ্গে মিল থাকায় চট করে ধরা পড়ে না। রোগীর প্রাণ নিয়ে পড়ে যায় টানটানি! কীভাবে ধরা পড়বে অসুখটি? কথা বলেছেন মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষক চিকিত্সক ডাঃ শুভেন্দু বাগ।
বছর দুয়েক আগের কথা। আমার চেম্বারে এসে হাজির হলেন এক ভদ্রলোক। এক সিভিক ভলান্টিয়ার। এসেই ম্রিয়মাণ গলায় বললেন, স্যার, এলাকার সব ডাক্তার দেখিয়ে ফেললাম, কিছুতেই জ্বর কমছে না।
জিজ্ঞেস করলাম, কতদিন ধরে জ্বর? উত্তর এল—প্রায় পনেরো দিন!
শুনেই চমকে উঠলাম। ভীতিপ্রদ ব্যাপার হলো, এই পনেরো দিনে রোগীর একাধিক রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষা হয়েছে। সেইসব টেস্ট-এ কোথাও ধরা পড়েছে জন্ডিস, কোথাও ইউরিন ইনফেকশন। কোথাও আবার ওয়াইডাল টেস্ট পজিটিভ—অর্থাৎ টাইফয়েড হয়েছে বলে ধরে নিয়েছেন কেউ কেউ। কোনো কোনো রিপোর্টে সিআরপি বা ব্লাড ইনফেকশনও বেশি, অর্থাৎ সেপটিসেমিয়ার লক্ষণ! সব মিলিয়ে অবস্থা একেবারে সঙ্গিন।
আমি তাঁকে ভালো করে পরীক্ষা করলাম। দেখলাম, তাঁর গায়ে ছোট ছোট লালচে র্যাশ বেরিয়েছে। তখন একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— আচ্ছা, জ্বর আসার চার-পাঁচ দিন আগে আপনি কি কোনো ঝোপঝাড়ে বা চাষবাসের কাজে হাত দিয়েছিলেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ স্যার, তখন ধানের নিড়ানি দেওয়ার কাজ করছিলাম
বললাম, ঠিক আছে, এবার পুরো জামাটা খুলুন তো!
জামা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত দৃশ্য— একটি লাল রঙের দাগ, যার মাঝখানে কালো ফোসকার মতো ডেড টিস্যু বা এসচার জমে রয়েছে।
এই দাগটি দেখতে পাওয়া চিকিৎসকের কাছে যেন একেবারে ‘ইউরেকা’ মুহূর্ত! কারণ এটিই স্ক্রাব টাইফাসের অন্যতম বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আর এর চিকিৎসা? বিশেষ সমস্যাবহুল নয়। একেবারে সাধারণ ও তুলনামূলক সস্তা একটি অ্যান্টিবায়োটিক—ডক্সিসাইক্লিন। ওরাল ক্যাপসুল বা প্রয়োজনে ইনজেকশন হিসেবে দিলেই অনেক সময় দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়।
রোগীর বাড়ির লোকজন অবশ্য প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, এতদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর শুধু একটি সাধারণ ওষুধেই সব ঠিক হয়ে যাবে! ঠিক দু’দিনের মাথায় তাঁদের মেসেজ এল—জ্বর আর আসেনি, কেবল সামান্য দুর্বলতা রয়েছে! এই চিকিত্সা সংক্রান্ত জটিলতার কারণ আছে।
এমন ঘটনা আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগেও আমাদের কাছে খুব পরিচিত ছিল না। একসময় মূলত দক্ষিণ ভারতের সমস্যা হিসেবেই স্ক্রাব টাইফাস রোগটিকে ভাবা হতো। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে গত চার-পাঁচ বছর ধরে স্ক্রাব টাইফাসের প্রকোপও উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়ছে।
স্ক্রাব টাইফাসের আদ্যোপান্ত
মূল সমস্যাটি আসলে কী? কোথা থেকেই বা এই রোগের সূত্রপাত?
স্ক্রাব টাইফাস হয় একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র পোকার কামড়ে। ইংরেজিতে এই পোকাটিকে বলা হয় ‘চিগার’। এই পোকার শরীরে থাকে একটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া, যার নাম ওরিয়েন্টিয়াম সুতসুগামুশি।
প্রধানত বৃষ্টি প্রধান এবং উষ্ণ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের ঝোপজঙ্গলে এই পোকা লুকিয়ে থাকে। পোকাটি কামড়ানোর পর ব্যাকটেরিয়াটি শরীরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তী সময়ে রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে। স্ক্রাব টাইফাসের কেমন বাড়বা়ড়ন্ত হয়েছে আর রোগ নির্ণয় কেমন জটিল সেই বিষয়ে বোঝানোর জন্য আর একটা উদাহরণ দিই। মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজের আরেকটি ঘটনার কথা বলি।
এক রোগী জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলেন! সিটি স্ক্যান-সহ সমস্ত রিপোর্ট করা হলো। দেখা গেল, লিভার এনজাইম—এসজিপিটি, এসজিওটি—মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। সিআরপি হাই। আর টোটাল লিউকোসাইট কাউন্ট ১১,০০০-এর জায়গায় ছাড়িয়ে গেছে ২২,০০০!
চারপাশে তখন রীতিমতো সেপটিসেমিয়া তৈরি হয়ে গেছে। রোগী ভুল বকছেন। অবস্থা এমন যে রোগী মৃত্যুর মুখোমুখি।
চিকিত্সারত ডাক্তারবাবুরা প্রথমে ভাবলেন, এনসেফালাইটিস কিংবা ডেঙ্গু। কারণ ডেঙ্গুর মতোই স্ক্রাব টাইফাসেও লিভার এনজাইম বেড়ে যেতে পারে, তীব্র ডিহাইড্রেশন হতে পারে এবং প্লেটলেট কমতে পারে। ব্লাড কাউন্ট এমনই হয় যে রিপোর্ট দেখে মনে হয় রোগীর বোধহয় ডেঙ্গু হয়েছে!
শেষ পর্যন্ত আমাদেরই এক চিকিৎসক বন্ধু বললেন— একবার স্ক্রাব টাইফাসের আইজিএম টেস্ট করিয়ে দেখা যাক না!
যেই না টেস্ট করানো হল, অমনি রিপোর্ট পজিটিভ।
আর যেইমাত্র ডক্সিসাইক্লিন ইনজেকশন দেওয়া হলো, তার মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে রোগী প্রলাপ বকা বন্ধ করে চোখ মেলে তাকালেন!
জন্ডিসটা অবশ্য কিছুদিন রয়ে গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
আগে আমরা যারা ২০১১ বা তার আগের ব্যাচের এমবিবিএস, তাঁরা নিজেদের প্র্যাকটিস জীবনে স্ক্রাব টাইফাস খুব একটা দেখিনি। কিন্তু এখন এই রোগটি কী ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে, তা আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে।
রোগটি চেনার উপায় ও লক্ষণ
এসচার: শরীরের কোথাও একটি লাল দাগের মাঝখানে কালো রঙের ক্ষত বা ডেড টিস্যু জমে থাকা স্ক্রাব টাইফাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ লক্ষণ। তবে সব রোগীর শরীরে এই লক্ষণ দেখা যাবে, এমন নয়।
জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ: হঠাৎ তীব্র জ্বর, গ্ল্যান্ড বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা, কাশি ও নিউমোনাইটিস, কনজাংটিভাইটিস এবং প্লীহা বা স্প্লিন বড় হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চোখের পেছনে ব্যথার মতো উপসর্গ থাকায় অনেক সময় রোগটি ডেঙ্গুর সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয়ে সতর্কতা: প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার সঙ্গে কিছু লক্ষণের মিল থাকায় রোগ নির্ণয়ে অনেক সময় চিকিৎসকেরাও বিভ্রান্ত হতে পারেন। ফলে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফলাফল একসঙ্গে বিচার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধের উপায় ও করণীয়
স্ক্রাব টাইফাস থেকে বাঁচতে প্রথমেই সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা মাঠে কাজ করেন, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেন কিংবা চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
সঠিক পোশাক: মাঠে বা ঝোপঝাড় পরিষ্কারের সময় ফুলহাতা জামা, ফুলপ্যান্ট এবং হাঁটু পর্যন্ত গামবুট পরা উচিত। শরীরের যতটা সম্ভব অংশ পোশাকে ঢেকে রাখা জরুরি।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: বাড়ির চারপাশের ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রয়োজনমতো ইনসেক্ট রিপেলেন্টও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওষুধের অপব্যবহার রোধ: ডক্সিসাইক্লিন বা অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে খাওয়া উচিত নয়। আবার চিকিৎসক যে সময়ের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতে বলেছেন, তার আগেই কোর্স বন্ধ করাও ঠিক নয়। নিয়ম না মেনে ওষুধ খেলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে। তখন এই ধরনের সংক্রমণের চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে, শরীরে অস্বাভাবিক র্যাশ দেখা দিলে কিংবা ঝোপঝাড় বা মাঠে কাজ করার ইতিহাস থাকলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসাই পারে স্ক্রাব টাইফাসের মতো নিঃশব্দ আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
অনুলিখন সুপ্রিয় নায়েক