Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বস্তিতে স্কুল

সেটাও ছিল এক বৃহস্পতিবার। ৩ এপ্রিলের সেই সকালে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেওয়ায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্কুলগুলির আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল।

স্বস্তিতে স্কুল
  • ১৯ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সেটাও ছিল এক বৃহস্পতিবার। ৩ এপ্রিলের সেই সকালে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেওয়ায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্কুলগুলির আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। জানুয়ারি মাসে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে যাওয়ার তিন মাস পর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে এসে দাঁড়ায়। বিশেষত শিক্ষকের অভাবে স্কুলের রোজকার ক্লাস কী করে চলবে—সেই প্রশ্নে রীতিমতো হাহাকার পড়ে যায়। কেন এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতির শিকার হবে স্কুলস্তরের নাবালক পড়ুয়ারা— সেই প্রশ্ন ওঠে সমাজের প্রায় সব স্তরে। অবশেষে সঙ্কটমুক্তির বার্তা দিয়েছে সেই সুপ্রিম কোর্টই। ১৭ এপ্রিল আরও এক বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ‘দাগি’ (অযোগ্য) হিসেবে চিহ্নিত নন এমন শিক্ষকরা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুলে যেতে পারবেন। তাঁরা পড়াতে পারবেন। সাড়ে আট মাসের এই অন্তর্বর্তী সময়ে ৩১ মে-র মধ্যে রাজ্যের মধ্যশিক্ষা পর্ষদকে নতুন নিয়োগের বিস্তারিত তথ্য বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করতে হবে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ শেষ করতে হবে। তার মানে, আচমকা কয়েক হাজার শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়ায় পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালতের নতুন ঘোষণায় সেই সংশয় অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হল। আক্ষরিক অর্থে স্বস্তি তাই স্কুল এবং পড়ুয়াদের। 

Advertisement

এমনিতেই গোটা দেশের মতো এ রাজ্যেও স্কুলস্তরে শিক্ষকের অভাব প্রকট। ২০০৯ সালে পাশ হওয়া শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী শিক্ষক-পড়ুয়ার অনুপাত হওয়া উচিত ৩০:১। অর্থাৎ ৩০ জন পড়ুয়া পিছু একজন শিক্ষক থাকবেন। কিন্তু এ রাজ্যে বর্তমানে এই অনুপাত ৫২:১। রাজ্যে এখন উচ্চ বিদ্যালয়ের মোট সংখ্যা ৯ হাজার ৪৮৭। এর মধ্যে একাদশ দ্বাদশ পড়ানো হয় ৬ হাজার ৯৫২টি স্কুলে। মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৭৮.৬ লক্ষ। এদের পড়ানোর জন্য প্রধানশিক্ষক বাদে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৮। ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে গত ৭ এপ্রিল মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ১১ পাতার যে নথি জমা দেয় সেখানেই রাজ্যের স্কুলগুলির এই সামগ্রিক ছবি তুলে ধরে জানানো হয়, যদি সুপ্রিম কোর্ট তাদের আর্জি পুনর্বিবেচনা না করে তাহলে রাজ্যের স্কুলগুলিতে শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত বেড়ে দাঁড়াবে ৫৮:১। এই অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের কাছে পর্ষদের আর্জি ছিল, নতুন নিয়োগ অথবা চলতি শিক্ষাবর্ষ— যেটা আগে শেষ হবে সেই সময় পর্যন্ত অযোগ্য বলে চিহ্নিত নন এমন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক। পর্ষদের এই আবেদনে সাড়া দিয়ে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও বঞ্চিত যোগ্য শিক্ষকদের কাজের সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। তার মানে ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নতুন করে শিক্ষকের আকাল তৈরি হবে না। ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, যা আসলে পড়ুয়াদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তবে বঞ্চিত যোগ্য শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রে কোনও স্বস্তির বার্তা আসেনি মহামান্য আদালতের নির্দেশে। সকলেই জানেন, স্কুল ঠিকঠাক মতো চালানোর জন্য শিক্ষাকর্মীদের অবদান নেহাত কম নয়। তাই শিক্ষাকর্মীদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলা ভালো, একটা ধোঁয়াশা কিন্তু রয়েই গেল।  
সর্বোচ্চ আদালতের নতুন নির্দেশে পড়ুয়া ও স্কুলগুলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে সন্দেহ নেই। এই নির্দেশের কারণে রাজ্য সরকার এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদও পরবর্তী পদক্ষেপ করার জন্য খানিকটা সময় পেল। কিন্তু আপাতত খানিকটা ‘অক্সিজেন’ পেলেও ৩১ ডিসেম্বরের পর যোগ্য শিক্ষকদের আর চাকরি থাকার কথা নয়। আদালতের নির্দেশ মেনে তাঁদেরও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে পুনরায় যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। এতে বঞ্চিতদের প্রত্যেকেই নতুন নিয়োগের যোগ্যতামান অতিক্রম করে ফের চাকরির সুযোগ পাবেন সেই নিশ্চয়তা কোথায়? এই প্রশ্ন তুলেছেন যোগ্য চাকরিহারাদের একাংশ। ফলে সাত বছর চাকরি করার পর দাগহীন এই বঞ্চিত যোগ্যদের জীবনে সুপ্রিম কোর্টের নতুন নির্দেশ কোনও স্বস্তির বার্তা বয়ে আনেনি বলে তাঁদের একাংশের অভিমত। তবে আশার কথা শুনিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এই শিক্ষকদের কাজে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে বলেছেন, চিন্তা করবেন না, সরকার আপনাদের সঙ্গে আছে। এই বছরেই সব সমাধান হয়ে যাবে। একটা স্বস্তি যখন হয়, ভবিষ্যতের স্বস্তিও তার উপর নির্ভর করে। মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বস্তির বার্তাই আপাতত বঞ্চিত যোগ্য শিক্ষকদের মূলধন হতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ