অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: বহু বছর ধরে গ্রামের শিব মন্দিরে পুজো দিতে পারতেন না শতাধিক পরিবার। কারণ, তাঁরা তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ। গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকজনের চোখরাঙানিতে মন্দিরে প্রবেশে বাধা ছিল তাঁদের। একুশ শতকের প্রগতিশীল বিশ্বে এই সামাজিক ভেদাভেদ স্তম্ভিত করেছিল উচ্চ আদালতকেও। অবশেষে, সেই তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রামের শিব মন্দিরে পুজো করার অধিকার পেলেন। বৃহস্পতিবার সাড়ম্বরে তফসিলি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার মন্দিরে ঢুকে পুজো দিলেন। গ্রামবাসীদের কথায়, ‘তাঁরা প্রায় সাত পুরুষ পর শিবমন্দিরে পুজো দিলেন। যাকে কেন্দ্র করে ছিল উৎসবের আমেজ। সেইসঙ্গে ছিল পুলিসের কড়া পাহারা। সাক্ষী থাকল কালীগঞ্জ থানার অন্তর্গত পালিতবেগিয়া পঞ্চায়েতের বৈরামপুর এলাকা।
কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার অতিরিক্ত পুলিস সুপার (গ্রামীণ) উত্তম ঘোষ বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে দেবগ্রাম ফাঁড়িতে মানুষজনকে নিয়ে বৈঠক হয়। তাতে আমরা সদর্থক বার্তা পাই। সেইমতো গ্রামের মানুষরা মন্দিরে পুজো দিয়েছেন। আশা রাখি, পরবর্তীতে এই নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। কালীগঞ্জ ব্লকের সিপিএম পরিচালিত পালিতবেগিয়া পঞ্চায়েতটি মুসলিম অধ্যুষিত। যদিও সেই পঞ্চায়েতের অন্তর্গত বৈরামপুর এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। সেখানে শতাব্দী প্রাচীন শিবমন্দির রয়েছে। এদিন সেই এলাকা বিশাল পুলিস বাহিনীতে মুড়ে ফেলা হয়। তারপর পুলিসের পাহারায় গ্রামের তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষজন শোভাযাত্রা করে মন্দিরে আসেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে শিবমন্দিরে তাঁরা পুজো দেন। জাতপাতের জটিলতায় পুজো দেওয়া থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন তাঁরা। অবশেষে সেই জটিলতা মেটায় খুশি ওই সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার।
গ্রামের বাসিন্দা সুচিত্রা দাস বলেন, ‘আমাদের পূর্ব পুরুষকেও এই মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারণ, আমরা নিচু জাতের মানুষ বলে। আমরা অনেকবার বলেছিলাম, মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হোক। আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আজকে মন্দিরে ঢুকতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’
গ্রামের আর এক মহিলা প্রতিমা দাস বলেন, ‘পুলিস ও ব্লক প্রশাসনের কাছে আগে এই সমস্যা নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমাদের সমস্যার সমাধান হয়নি। তারপর আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই। গত বুধবার দুই তরফের লোকজন প্রশাসনের তরফ থেকে বৈঠক ডাকা হয়। বৃহস্পতিবার মন্দিরে পুজো দিতে পেরে খুব আনন্দ হচ্ছে। তবে, পুলিস আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। ওরা না থাকলে আমার আজ এই জায়গায় আসতে পারতাম না।’
বৈরামপুরের তফফিলি মানুষদের মন্দিরে ঢুকতে বাধা দেওয়ার জন্য আদালতে মামলা হয়। গত সোমবার বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, বাংলায় এমন পরিস্থিতি কোনওদিন ছিল না। তাহলে এখন কেন এরকম পরিস্থিতি তৈরি হবে? গোটা বিষয়টি নিয়ে পুলিসকেও তীব্র ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি। অভিযোগ শুনে বিচারপতি বলেছিলেন, কী করে এটা হয়? পুলিসের ভূমিকা কী? একটা মানুষ তার অধিকার পাবে না? সেইমতো আদালতের তরফ থেকে পুলিসকে আগামী ২১ মার্চ শুক্রবারের মধ্যে রিপোর্ট তলব করা হয়। তার আগেই পুলিস বৃহস্পতিবার তফসিলি মানুষদের জন্য মন্দিরে প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করে।