Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সুভাষের আদর্শে ‘তরুণ শক্তি’ সম্পাদনা, কারারুদ্ধ হন সাঁতুড়ির বিপ্লবী অন্নদাপ্রসাদ

দেশ তখন ইংরেজদের অধীনে। স্কুলে আসবেন পঞ্চম জর্জ। ছেলেদের করজোড়ে গাইতে হবে সাহেব প্রভুর বন্দনা। কিন্তু  বেঁকে বসল সাত বছরের বালকটি।

সুভাষের আদর্শে ‘তরুণ শক্তি’ সম্পাদনা, কারারুদ্ধ হন সাঁতুড়ির বিপ্লবী অন্নদাপ্রসাদ
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সজল মণ্ডল, রঘুনাথপুর: দেশ তখন ইংরেজদের অধীনে। স্কুলে আসবেন পঞ্চম জর্জ। ছেলেদের করজোড়ে গাইতে হবে সাহেব প্রভুর বন্দনা। কিন্তু  বেঁকে বসল সাত বছরের বালকটি। ফল শিক্ষকদের হাতে বেতের মার। ছোটবেলা থেকেই দেশের প্রতি ওই বালকের বড় টান যে। বড় হয়ে দেশের কাজেই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। ভারত মাতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে কারাবন্দিও হন। জীবনভর দুঃস্থ মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, মানভূম তথা পুরুলিয়া জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন কর্মী ও দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাঁতুড়ি ব্লকের রামচন্দ্রপুর গ্রামের অন্নদাপ্রসাদ চক্রবর্তী। যিনি পরবর্তী সময়ে অসীমানন্দ সরস্বতী নামেও খ্যাত হন। ছাত্রজীবন থেকে দেশের প্রতি এই বিপ্লবীর ছিল অটুট ভালোবাসা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজের প্রচেষ্টায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় অন্ধদের আলো দিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন রামচন্দ্রপুর চক্ষু  হাসপাতাল।

Advertisement

ইতিহাস বলছে, ১৯০৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাঁতুড়ি ব্লকের রামচন্দ্রপুর গ্রামে অন্নদাপ্রসাদ চক্রবর্তীর জন্ম হয়। অন্নদাপ্রসাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের বাসিন্দা। তাঁরা পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজ পরিবারের পুরোহিত হয়ে এসেছিলেন। রাজ পরিবারের সৌজন্যে রামচন্দ্রপুরে জমিদারি প্রাপ্ত হন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রিটিশ শাসনের প্রতিবাদে ছোট্ট অন্নদাপ্রসাদ লিখেছিলেন, ‘যারা তাঁতির কাটলো আঙুল, তাদের দেব জয়, জীবন থাকতে নয়।’ ১৯১৮ সালে বিপ্লবীদের গোপন সংস্থা ‘আর্য আশ্রম’ গড়ে তোলেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হন। ১৯২৮ সালের মার্চে রামচন্দ্রপুরে এক কর্মিসভা হয়েছিল। দু’দিনের কর্মিসভায় বাংলা থেকে স্বদেশীরা যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এই সভা থেকেই জন্ম নেয় ‘মানভূম কর্মী সংসদ’ নামে এক নয়া সংগঠন। তাতে সুভাষচন্দ্র বসু সভাপতি এবং অন্নদাপ্রসাদ সম্পাদক হন। ‘তরুণ শক্তি’ নামের পত্রিকার সম্পাদনা করার জন্য ব্রিটিশরা অন্নদাপ্রসাদকে কারারুদ্ধ করে রাখে। প্রায় দেড় বছর কারারুদ্ধ থাকার পর মুক্তি পান। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য ব্রিটিশ শাসক তাঁর বাড়িতে ঢুকে সমস্ত বইপত্র পুড়িয়ে ফেলে। অন্নদাপ্রসাদকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু ক্ষমা না চাওয়ার জন্য গাছে বেঁধে প্রহার করা হয় এই বিপ্লবীকে। জ্ঞান হারালে ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ির পিছনে দড়ি বেঁধে একটি পুকুরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয় অন্নদাপ্রসাদকে। শেষে অনুগামী ও গ্রামবাসীদের পরিচর্যায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হন।
১৯৪০ সালে সুভাষচন্দ্র বসু অন্নদাপ্রসাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সেই সময় শীতের রাতে নেতাজি অন্নদাপ্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরগাড়িতে কলকাতার উদ্দেশে আদ্রা রেলস্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য যাচ্ছিলেন। তখন এক দৃষ্টিহীন দরিদ্র মানুষ তাঁদের গাড়ির সামনে এসে পড়েন। সুভাষচন্দ্র বসু সেই দৃশ্য দেখে অন্নদাপ্রসাদকে নিপীড়িত মানুষের জন্য একটি দাতব্য চক্ষু হাসপাতাল গড়ার অনুরোধ করেছিলেন।
জানা গিয়েছে, ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্রের মহানিষ্ক্রমণের পর ভেঙে পড়েছিলেন অন্নদাপ্রসাদ। তাই কাশীর শ্রী শ্রী বিজয় কৃষ্ণ মঠের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী কিরণচাঁদ দরবেশের কাছে দীক্ষা নেন। ১৯৪৭ সালে সন্ন্যাস নিয়ে শুরু হয় তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন। অন্নদাপ্রসাদের নতুন নাম হয় স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতী। ১৯৫৩ সালের ২৩ জানুয়ারি সুভাষ বসুর জন্মদিনেই রামচন্দ্রপুরে নেতাজি চক্ষু হাসপাতাল গড়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রয়াণ হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের এই বিপ্লবীর।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ