সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: নফরচন্দ্র পালের ইট ব্যবহার করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তা যেত বিলেতে। সুখ্যাতি পেত বাংলায় তৈরি ইট। সেই নফরচন্দ্রের বাড়িতে ১৭০ বছর ধরে হচ্ছে দুর্গাপুজো। সাঁকরাইলে রয়েছে এদের বনেদি বাড়িটি। এখানে পুজোর সময় ভিন্ন নিয়ম মানা হয়। দশমীতে নয় অষ্টমীতে সিঁদুর খেলেন বাড়ির মহিলারা।
আন্দুল রাজবাড়ির দেওয়ান ছিলেন এই বংশের চূড়ামণি পাল। তিনি রাজার কাছ থেকে গঙ্গার তীরবর্তী রাজগঞ্জে তিনখানি গ্রামের জমিদারিত্ব পেয়েছিলেন। তারপর হাওড়ার রাজগঞ্জে অট্টালিকাসম জমিদার বাড়ি তৈরি হয়। বসবাস শুরু করে পালরা। তখনই শুরু তাদের দুর্গাপুজো। বাড়ির বিশাল দুর্গামণ্ডপ, প্রশস্থ উঠোন, তিনদিক খোলা বারান্দা। সেসব এখনও অটুট। চূড়ামণির বংশধররা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ব্যবসা। এই বংশেরই কৃতী মানুষ নফরচন্দ্র। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে কারিগরি শিক্ষা লাভ করেন তিনি। তৈরি করেন ইটভাটা। অচিরেই এই বঙ্গ সন্তানের তৈরি ইট সুনাম কুড়োয়। নাম ছড়িয়ে পড়ে ব্রিটেন পর্যন্ত। এন সি পালের ইট বিখ্যাত হয়ে ওঠে। কলকাতার বহু নামকরা স্থাপত্য সেই ইটেই তৈরি হয়েছিল।
পালবাড়ির দুর্গাপুজোর সে যুগের আভিজাত্য এখন নেই। তবে ঐতিহ্য রয়েই গিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের সদস্য স্বরূপ পাল জানান, পুরোহিত থেকে ঢাকি, প্রত্যেকেই বংশ পরম্পরায় বাড়ির পুজোয় সামিল হয়ে আসছেন। বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। দেবী এখানে একচালার। ডাকের সাজ। এই পরিবারের কাছে উমা এ বাড়িরই মেয়ে। ফল, নানা ধরনের নাড়ু ও মিষ্টি দিয়ে সাজানো হয় তার নৈবেদ্য। অষ্টমীর ভোগ বিতরণ করা হয় গ্রামবাসীদের মধ্যে। সিঁদুর খেলার বিশেষ প্রথার নেপথ্যে লুকিয়ে এক মর্মান্তিক কাহিনি। বাড়ির বড় ছেলে ললিতচন্দ্র পাল মাত্র ১৮ বছর বয়সে মারা যান। সে দিনটি ছিল দুর্গাষ্টমী। সেদিনই বাড়িতে মরদেহ রেখে সিঁদুর খেলা হয়। যাবতীয় নিয়ম সম্পন্ন করে বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয় দেবীকে। তারপর থেকে অষ্টমীতেই হয় সিঁদুর খেলা। তাতে অংশ নেন গ্রামের সধবা মহিলারাও। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, নফরচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে নিশ্চিন্তে পুজোর দায়িত্ব নিতে পারে তার জন্য তৈরি করে গিয়েছিলেন দেবত্র ট্রাস্ট। আন্দুল বাস স্ট্যান্ড এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়িক জায়গা থেকে ট্রাস্টে সারাবছর টাকা জমা করা হয়। সেই টাকাতেই এখন হয় পালবাড়ির দুর্গাপুজো।