দত্তাত্রেয় হোসাবলে: যখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তার সেবার শতবর্ষ পূর্ণ করছে, তখন এই বিশেষ মুহূর্তটিকে সঙ্ঘ কীভাবে উপলব্ধি করে তা নিয়ে জনমানসে একটি স্পষ্ট কৌতূহল রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সঙ্ঘের কাছে এটা স্পষ্ট যে এই ধরনের অনুষ্ঠান নিছক উদযাপনের বিষয় নয়, বরং আমাদের আত্মবিশ্লেষণ এবং উদ্দেশ্যের প্রতি পুনরায় নিবেদিত হওয়ার একটি সুযোগ। আন্দোলন পরিচালনায় যেসকল অদম্য সাধু ব্যক্তিত্ব নিঃস্বার্থভাবে তাঁদের অবদান রেখেছেন, এই মাহেন্দ্রক্ষণ তাঁদের স্বীকৃতি জানানোরও একটি সুযোগ। সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের জন্মবার্ষিকীর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। এই ‘বর্ষ প্রতিপদ’ হল হিন্দু পঞ্জিকার প্রথম দিন। ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ার সংকল্পের শতবর্ষের যাত্রাকে ফিরে দেখা। উদ্দেশ্য বিশ্ব শান্তি ও সমৃদ্ধি।
ডঃ হেডগেওয়ার আজন্ম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। ভারতের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং নিখাদ নিষ্ঠার এই বৈশিষ্ট্যটি তাঁর আশৈশব কর্মকাণ্ডেই স্পষ্ট ছিল। তিনি কলকাতায় চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করতে প্রয়াসী তিনি তখন থেকেই। এজন্য সশস্ত্র বিপ্লব থেকে সত্যাগ্রহ—সমস্ত প্রচেষ্টার সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। সঙ্ঘ মহলের প্রিয় ডাক্তারজি এই দুই পথের কোনোটিকেই ছোটভাবে দেখার চেষ্টা করেননি। তৎকালে আলোচনার মূল বিষয় ছিল সামাজিক সংস্কার বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা। একইসঙ্গে, ভারতীয় সমাজের একজন চিকিৎসক হিসেবে আমাদের স্বাধীনতা হারানোর কারণগুলিও তিনি খুঁজে বের করেন এবং সেসবের স্থায়ী সমাধান দিতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন বহিরাগত আক্রমণকারীদের ভারতে অনুপ্রবেশের কারণ ছিল একাধিক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দৈনন্দিন জীবনে দেশপ্রেমের অনুপস্থিতি এবং জাতীয় চরিত্রের সার্বিক অবক্ষয়। তার ফলে তৈরি হয়েছিল সংকীর্ণ পরিচয় এবং সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলার দীনতা। তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল যে, অবিরাম আগ্রাসনের কারণেই আমাদের গৌরবময় ইতিহাস দেশবাসী বিস্মৃত হচ্ছে। তাই আমাদের সংস্কৃতি এবং জ্ঞানের জগতের ঐতিহ্য সম্পর্কে তৈরি হয়েছিল হতাশাবাদ। আমাদের গ্রাস করেছিল হীনমন্যতার অনুভূতি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সামান্য কয়েকজনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সক্রিয়তা প্রাচীন ভারত রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারবে না। তাই তিনি জাতির উত্থানে মানুষকে প্রশিক্ষণ প্রদানের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা নেন। রাজনৈতিক সংগ্রামের বাইরে এই দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফলাফল হল—সঙ্ঘের ‘শাখা পদ্ধতি’ ভিত্তিক উদ্ভাবনী এবং অনন্য কর্মকাণ্ড।
তিনি নিজে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন। অন্যদেরও তাতে উৎসাহিত করেন। ডাঃ হেডগেওয়ার তার পাশাপাশি সমাজের মধ্যে কোনও সংগঠন গড়ার বদলে সমগ্র সমাজকে সংগঠিত করার জন্য এই প্রশিক্ষণ পদ্ধতিটি তৈরি করেন। আজ, শতবর্ষ পরেও হাজার হাজার যুবক ডাঃ হেডগেওয়ারের দেখানো পথে যোগ দিচ্ছেন। জাতীয় স্বার্থে নিজেদের উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত তাঁরা। সঙ্ঘের প্রতি সমাজের গ্রহণযোগ্যতা এবং সঙ্ঘের কাছে প্রত্যাশা ক্রমশ বাড়ছে। এগুলি ডাক্তারজির ভাবনা এবং কর্মপদ্ধতিকে অনুমোদন বইকি।
এই আন্দোলন এবং দর্শনের প্রগতিশীল বিকাশ একটি অলৌকিক ঘটনা থেকে ন্যূন নয়। ইংরেজি-শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির বেশিরভাগ মানুষ যখন সংকীর্ণ ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ধারণায় প্রভাবিত তখন ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘রাষ্ট্র’-এর ধারণা ব্যাখ্যা করা সহজ ছিল না। ডাঃ হেডগেওয়ার আদর্শকে তত্ত্বের মোড়কে আবদ্ধ করেননি। কিন্তু তিনি বীজবপণের মতো করে একটি ‘অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ সামনে আনেন। ওই যাত্রায় সেটাই হয়ে ওঠে পথপ্রদর্শক শক্তি। তাঁর জীবদ্দশায়, সঙ্ঘের কাজ ভারতময় হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের স্বাধীনতা অর্জন এবং ধর্মের ভিত্তিতে ভারতভাগের মতো দুর্ভাগ্য যুগপৎ ঘটে যায়। তখন সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা পাকিস্তান থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উদ্ধার এবং সসম্মানে তাঁদের পুনর্বাসন দিতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন। ‘সংগঠনের স্বার্থে সংগঠন’ মন্ত্রটি জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শক্তি সঞ্চার করেছিল। স্বয়ংসেবকরা সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যবোধের ধারণা শিক্ষা থেকে শুরু করে শ্রম, রাজনীতি পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে দেখাতে থাকেন। জাতীয় নীতিমালার আলোকে সবকিছু পুনর্গঠন করতে এই পর্যায়ে পথপ্রদর্শক শক্তি হয়ে ওঠেন দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক শ্রীগুরুজি (মাধব সদাশিব গোলওয়ারকর)। আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার, মানবতার স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করার দায়িত্ব রয়েছে। ভারতকে সর্বজনীন সম্প্রীতি এবং একতার ধারণার উপর ভিত্তি করে ভূমিকা পালন করতে হলে জনগণকে সেই লক্ষ্যের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। শ্রীগুরুজি এজন্য একটি শক্তিশালী আদর্শগত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। হিন্দু সমাজের সংস্কারবাদী এজেন্ডা নতুন গতি লাভ করে যখন ভারতের সকল সম্প্রদায় ঘোষণা করে যে, কোনও ধরনের বৈষম্যের কোনও ধর্মীয় অনুমোদন নেই। জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের উপর নির্মম আক্রমণ নেমে আসে। তখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে স্বয়ংসেবকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শাখার ধারণা থেকে সঙ্ঘ বিস্তারলাভ করেছে। সমাজের ধার্মিক শক্তিকে আহ্বান করেছে সেবামূলক কর্মকাণ্ডে। গত ৯৯ বছরে সঙ্ঘের এই অগ্রগতি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। রাম জন্মভূমি মুক্তির মতো আন্দোলনগুলি ভারতের সকল অংশ এবং অঞ্চলকে সাংস্কৃতিক মুক্তির পক্ষে সংযুক্ত করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে গ্রামোন্নয়ন—জাতীয় জীবনের এমন কোনও দিক নেই যেখানে স্বয়ংসেবকরা ছুঁয়ে যাননি। সবচেয়ে খুশির খবর হল, এই পদ্ধতিগত রূপান্তরের অংশ হতে স্বয়ং সমাজই এগিয়ে আসছে।
যদিও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু দেখার প্রবণতা রয়েছে, তবুও সঙ্ঘ এখনও সমাজের সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং ডানপন্থী মানুষ ও সংগঠনের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরির উপর মনোনিবেশ করছে। সামাজিক রূপান্তরে নারীর অংশগ্রহণ এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা পুনরুদ্ধার সঙ্ঘের লক্ষ্য। সঙ্ঘ লোকমাতা অহল্যাবাঈ হোলকরের ত্রি-শতবার্ষিকী উদযাপনের ডাক দেয়। তাতে ভারতজুড়ে হাজার দশেক অনুষ্ঠান হয়েছে। সব মিলিয়ে যোগ দেন ২৭ লক্ষাধিক নরনারী। এই ঘটনা নিঃসন্দেহে আমাদের ন্যাশনাল আইকনদের সম্মিলিতভাবে সম্মান প্রদর্শনের সাক্ষ্য দেয়। শতবর্ষে পা দিয়ে জাতি গঠনে সঙ্ঘের কর্মকাণ্ড তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত একবছরে দশ হাজার শাখা যোগ করা গিয়েছে। এই ঘটনা নিয়মতান্ত্রিক পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের প্রতীক। প্রতিটি গ্রাম এবং বস্তিতে পৌঁছনোর লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে। পাঁচ-পরিবর্তনের আহ্বান—অর্থাৎ রূপান্তরের জন্য পাঁচ-স্তরের কর্মসূচি—আগামী বছরগুলিতেও মূল লক্ষ্য থাকবে। সঙ্ঘ শাখা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য নাগরিক কর্তব্য, পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাপন, সুরেবাঁধা সামাজিক আচরণ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রূপান্তরের উপর জোর দিয়েছে। দেখতে হবে প্রত্যেকেই যাতে ‘পরম বৈভবম নেতাম এতৎ স্বরাষ্ট্রম’-এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যে নিজ নিজ অবদান রাখতে পারেন। এর অর্থ হল—আমাদের রাষ্ট্রকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিতে হবে।
গত একশো বছরে, জাতীয় পুনর্গঠনের আন্দোলন হিসেবে সঙ্ঘ অবহেলা ও উপহাস থেকে কৌতূহল ও গ্রহণযোগ্যতার দিকে যাত্রা করেছে। সঙ্ঘ কারও বিরোধিতায় বিশ্বাস করে না। তারা বরং আত্মবিশ্বাসী যে, আজ যাঁরা সঙ্ঘের কাজের বিরোধিতা করছেন তাঁরাই একদিন সঙ্ঘের বৃত্তে প্রবেশ করবেন। বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে হিংসাশ্রয়ী সংঘাত পর্যন্ত নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন ভারতের প্রাচীন এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অনবদ্য সমাধানের রাস্তা বলে দিতে পারে। এই বিশাল কিন্তু অনিবার্য কাজটি তখনই সম্ভব যখন ভারত মাতার প্রতিটি সন্তান এই ভূমিকাটি বুঝবেন এবং এমন একটি দেশীয় মডেল তৈরিতে নিজ নিজ অবদান রাখবেন—এগুলি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। আসুন, বিশ্বের সামনে একটি সুসংগঠিত ও ছন্দোবদ্ধ ভারতের আদর্শ উপস্থাপন করার জন্য সংকল্প গ্রহণ করি। এই উদ্যোগ সমগ্র সমাজকে ধার্মিক ব্যক্তিদের (সজ্জন শক্তি) নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করবে।
• লেখক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরকার্যবাহ।
মতামত ব্যক্তিগত