নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: চড়া রোদ। দিনের বেলাতেই বারাসতের কালীপুজোয় তখন মানুষের থিকথিকে ভিড়। ঢাক বাজছে, মাইক থেকে ভেসে আসছে আরতির শব্দ। গরমে হাঁপিয়ে ওঠা মুখে ঘাম ঝরছে। তবু আনন্দে খামতি রাখছে না কেউ। সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটছে দুই যুবক। হাতে তালপাতার পাখা, কাঁধে ব্যাগে রঙিন টুপি। কারও মাথায় ছায়া দিচ্ছে, কারও মুখে একটুখানি হাসি। নাম শেখ সাইফুদ্দিন ও রুহুল আমিন। সোমবার তাঁরা কালীপুজোর দিনে ছায়া বিক্রি করছেন। অনেকে বললেন, ওঁরা ‘ছায়ার ফেরিওয়ালা’।
বারাসতে কালীপুজো মানেই আলাদা উচ্ছ্বাস। থাকে স্মৃতি। যা আজও বয়ে বেড়ায় মানুষ। তেমনই হল রুহুল আর সাইফুদ্দিনরা। বাড়ি ডায়মন্ডহারবারে। পেশায় দিনমজুর। মূলত তাঁদের সংসার চলে অন্যের উপর ভরসা করেই। পাশাপাশি তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন হারানো সেই তালপাতাকে। আর তা দিয়েই তৈরি করেছেন পাখা-টুপি। বারাসতে কালীপুজোর বাজারে ঘুরে ঘুরে তা বিক্রি করছেন। তাঁদের মুখে একটাই কথা— ‘পাখা, টুপি নেবেন তো আসুন। গরমে পাবেন স্বস্তি’। কালীপুজোয় রাতের দিকে অল্প অল্প ঠান্ডা থাকলেও, দিনে প্রচণ্ড গরম। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই দিনে দর্শনার্থীরা আসছেন। আর গরমে তাঁদের একটু শান্তি দিতে ছায়া ফেরি করছেন সাইফুদ্দিন ও রুহুলরা। বারাসতের কলোনি মোড় থেকে টাকি রোড সব পুজো মণ্ডপেই তাঁরা ঘুরছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের এই লড়াই শুধু পরিবার বাঁচানো নয়, সম্প্রীতি রক্ষার চ্যালেঞ্জও। বলছিলেন, প্রতিদিন ভোর ৪টের সময় বাড়ি থেকে বের হন তাঁরা। তারপর ট্রেন ধরে আসেন শিয়ালদহ স্টেশনে। আবার ট্রেন ধরে বারাসতে। সকালে স্টেশনের কাছে টিফিন সেরে শুরু হয় ফেরি করা। বিকেল ৫টার পর ফের খাওয়া-দাওয়া সেরে রওনা দেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। এই ক’দিন রোজগার বেশ ভালোই হয়েছে বলে কিছুটা স্বস্তিতে তাঁরা। কথার ছলে বলতে থাকলেন, শেষ দু’দিন ভালোই বিক্রি হয়েছে। জানি না, পুজোর কটা দিন কী হবে। আশায় রয়েছি। টুপি রয়েছে দু’ধরনের। বাচ্চাদের টুপির দাম ৪০ টাকা, আর বড়দের ৬০ টাকা। হাত পাখা বিক্রি করছি ৫০ টাকায়। আপ-ডাউনে খরচ হয় ৫০ টাকা। আর খাবার নিয়ে ২০০ টাকায় শেষ। কিন্তু এখানে তো আর তা হবে না! সাইফুদ্দিন বলেন, আমাদের এটাই পেশা। গরমে মানুষ একটু হাওয়া পেলে যে হাসিটা দেয়, সেটাই যেন আশীর্বাদ। এই টাকায় চলে সংসার। মেয়ের পড়াশোনা। রুহুল বলেন, আমাদের দোকান ছোট। কিন্তু এখানে অনেক ভালোবাসা মেলে। আমরা মুসলিম। কিন্তু পুজোয় নিজেদের আলাদা মনে হয় না। নিজস্ব চিত্র