Bartaman Logo
১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ক্রীড়াক্ষেত্রেও গেরুয়াকরণ!

ভারতের হকির ঐতিহ্য অত্যন্ত গৌরবময় ও সমৃদ্ধ। এর মূল স্তম্ভ হল ওলিমপিকে অসামান্য সাফল্য, জাদুকর ধ্যানচাঁদের অনস্বীকার্য অবদান এবং শতবর্ষের ঐতিহাসিক যাত্রা

ক্রীড়াক্ষেত্রেও গেরুয়াকরণ!
  • ১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতের হকির ঐতিহ্য অত্যন্ত গৌরবময় ও সমৃদ্ধ। এর মূল স্তম্ভ হল ওলিমপিকে অসামান্য সাফল্য, জাদুকর ধ্যানচাঁদের অনস্বীকার্য অবদান এবং শতবর্ষের ঐতিহাসিক যাত্রা। হকির স্বর্ণযুগে ওলিমপিকে সোনার হ্যাটট্রিক রয়েছে ভারতের। ১৯২৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ভারত আটটি স্বর্ণপদক জিতেছে। তার মধ্যে টানা তিনটি সোনা জয়ের রেকর্ড রয়েছে দুবার! প্রথম সাফল্য আসে ব্রিটিশ আমলে। ১৯২৮ সালে আমস্টারডাম ওলিমপিকে ভারত প্রথম স্বর্ণপদক অর্জন করে। স্বাধীন দেশে প্রথম ওলিমপিক পদক লাভ ১৯৪৮-এ। ধ্যানচাঁদের জাদুকরি স্টিকের ছোঁয়ায় হকি বিশ্বে ভারত এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ওলিমপিকে বহু গোল করে দেশকে একাই জয় এনে দিয়েছেন তিনি বারেবারে। তাঁর পাশাপাশি রাখতে হবে বলবীর সিং সিনিয়রকে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ও ওলিমপিক ফাইনালে তাঁর রেকর্ড করা গোলগুলি ভারতীয় হকির গৌরবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

Advertisement

দীর্ঘকাল যাবৎ নীল রঙের জার্সি আর কৃত্রিম টার্ফে দারুণ সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হয়ে ওঠে ভারতীয় হকি দল। নীল জার্সি হয়ে ওঠে এক ঐতিহ্যের অভিজ্ঞান। কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্যেই ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হকি ইন্ডিয়া দলের জার্সির নীল রং বদলে যাচ্ছে, খেলোয়াড়দের গায়ে উঠবে গেরুয়া রঙের জার্সি। স্বভাবতই তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশের ক্রীড়ামহলে।  আগামী ২০২৬ হকি বিশ্বকাপের মুখে এই স্পর্শকাতর পরিবর্তনকে সংশ্লিষ্ট মহল অবাঞ্ছিত বলেই মনে করছে। দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় দল মানেই ‘ম্যান ইন ব্লু’ বা নীল জার্সি। এই রঙের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের অগণিত হকিপ্রেমীর আবেগ এবং বহু ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতি। জাতীয় হকি টিমের জার্সির রং বদলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি প্রাক্তন অধিনায়ক বীরেন রাসকিনা। বিরূপ প্রশ্ন তুলেছেন এবং তির্যক মন্তব্য করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নানা মাপের নেতারা। এই সমালোচনার কোনোটাই অন্যায্য নয়। ভারতীয় হকি দলের মূল স্পনসর ওড়িশা সরকার। নবীন পট্টনায়েকের আমলে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশের হকিকে নয়া উচ্চতায় পৌঁছে দিতে ও‌঩ড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা এনডিএর একদা শরিক বিজেডি সুপ্রিমোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। হকি জার্সির রং বদল নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনিও। যদিও শাসকও যুক্তি সাজিয়েছে রং বদলের পক্ষে। দৃশ্যমানতার সমস্যাকে বড়ো করে দেখিয়েছে তারা। হকি ইন্ডিয়ার দাবি, আধুনিক সিন্থেটিক টার্ফ বা খেলার মাঠগুলি সাধারণত নীল রঙের হয়। এর ফলে মাঠের রঙের সঙ্গে খেলোয়াড়দের নীল জার্সি মিশে যায় এবং দৃশ্যমানতায় সমস্যা তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে পূর্বের একাধিক নজিরও। যেমন ২০১৪ বিশ্বকাপে হলুদ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে আকাশি নীল জার্সি ব্যবহার করা হয়েছিল। খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের পরামর্শেই ভালো দৃশ্যমানতার জন্য গেরুয়া রং বেছে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জার্সির রং বদল নতুন কিছু নয়। এমনকি জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে জাতীয় হকি দলের রঙের সাযুজ্য রেখেও মাহাত্ম্য প্রচারের চেষ্টা হয়েছে। 
তবে সরকার যে যুক্তিই সাজাক না কেন, তা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই শোনাচ্ছে। এই সরকারের সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপকে সাধারণভাবে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখার অবকাশ কমই মেলে। কারণ এরা সংঘ পরিবারের আদর্শে পরিচালিত। সংঘের এজেন্ডার বাস্তবায়নই যে এদের ধ্যানজ্ঞান তা একটি বালকও জানে। সেইমতো স্থাননাম থেকে শিক্ষাক্রমের পাঠ্যসূচি, এমনকি দেশের ইতিহাস অব্দি বদলে ফেলতে এরা মরিয়া। বস্তুত সবকিছুতেই বিদেশি বা ম্লেচ্ছদের ভূত দেখে এরা। এই অদ্ভুত সংস্কৃতির ধারকবাহকদের বিচারে শুদ্ধি ও বিশুদ্ধতার একমাত্র পথ নির্বিচারে গেরুয়াকরণ। হকি খেলোয়াড়দের জার্সির রং গেরুয়া করে ফেলাটা তাই যে আলাদা কিছু নয়—এই অনুমান অভ্রান্ত—এটি গেরুয়াকরণেরই অঙ্গ। খেলার মাঠে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং খেলোয়াড়দের সুবিধা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ ও ঐতিহ্যকে নস্যাৎ করে দেওয়া অনুচিত। পোশাকের রং যাই হোক না কেন, আসল কথা হল হকি মাঠে ভারতের জয়ের ধারা এবং দেশের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা। এই ডামাডোলে তা যেন কোনোভাবেই নষ্ট না-হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ