প্রশ্ন: রাগ ও অভিমানের তফাৎ কী?
প্রশ্ন: রাগ ও অভিমানের তফাৎ কী?
উত্তর: দুটোরই মূলে হচ্ছে অহঙ্কার। তবে এ দুটির প্রকাশভঙ্গির ওপর নির্ভর করে তার নাম। এর ভেতরে আবার কম বেশিও আছে। যেমন, রাগের প্রচণ্ড রূপ যেটি সেটিকে আমরা শুদ্ধ ভাষায় বলি ক্রোধ। সাধারণতঃ কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় হঠাৎ রেগে উঠে মাথা গরম হয়ে গেল কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ থাকে না। হয়তো দুটো একটা বলে ফেলল, আবার জল হয়ে গেল। সতের রাগ জলের দাগ। সে রাগে কোনও ক্ষতি হয় না। সেগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বা instinct-এ অনুস্যূত হয়ে আছে। কিন্তু এই রাগই যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করে, একটা বিষময় পরিণতির সৃষ্টি করে, তখন সেটিকে বলি প্রচণ্ড রাগ বা ক্রোধ। সেটি একান্তভাবে বর্জন করা উচিত। রাগ হ’ল, দু এক কথা বলে ফেললাম। সেখানেই চুকে গেল ব্যাপারটা। তা না ক’রে এক একটি মানুষ থাকে যারা সামান্য ঘটনাকে নিয়ে মনের ভেতর brood করতে থাকে, জের টেনে রেখে সারা জীবনের মত পুষে রাখে। এই রাগগুলি একান্ত ক্ষতিকর—শরীর ও মন দুটোর জনাই।
ঠাকুর সত্যানন্দদেব বলতেন, এই ধরণের রাগ ভেতরে পুষে রাখলে মাথা শুদ্ধ খারাপ হয়ে যায়। মানুষ পাগল হয়ে যায়। রোগগ্রস্ত হয়ে যায়। মনের পক্ষে তো এটা ক্ষতিকর বটেই। ঠাকুরের কাছে শুনেছি প্রচণ্ড রাগী একটা মানুষের শরীরের রক্ত টেনে নিয়ে যদি আর একজন মানুষের শরীরের মধ্যে push করা যায় তো তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যায়। এমনি বিষ সে রাগের। কাজেই এ ধরণের যে রাগ বা ক্রোধ, তাকে পরিত্যাগ করা সর্বভাবে কর্তব্য।
আর অভিমানের ব্যাপক অর্থ যদি আমরা করি তাহলে, যেটাকে মহাজনরা বলেছেন, “নরক মূল অভিমান”, সে অভিমান হচ্ছে অহংকারেরই আর একটি রূপ। যেমন, আমি বড়লোক, আমি ব্রাক্ষণ, আমি কায়স্থ, বড় জাত, বড় বংশজাত, কি আমি পণ্ডিত, জ্ঞানী ইত্যাদি নানা রকমের অভিমান, যার ফলে একটি মানুষের থেকে আর একটি মানুষের একটা বিরাট ব্যবধান এসে যায়। এই অভিমানও আমাদিকে আধ্যাত্মিক পথ থেকে সরিয়ে দেয়। তবে এই অভিমানের যেটি মিষ্টি রূপ বা একটু কোমলরূপ আমরা দেখি, যেমন, আমি তোমাকে দুটো কথা বললাম, তোমার মনে সেটা লাগলো, তোমার অভিমান হ’ল, তোমার দুঃখ হ’ল, তুমি কাঁদতে লাগলে। কোনও সামান্য ব্যাপারে একটু অভিমান হল, সেগুলো ক্ষতিকর নয়।
তবে এই অভিমান এই রাগের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটা process আছে আধ্যাত্মিক জগতে। কথামৃতে এটি পাই। যেমন কোনও ভক্ত ঠাকুরের কাছে বিশেষ কৃপা পাচ্ছে। আর একটা ভক্তের তাই দেখে একটু কান্না পেল, অভিমান এল, ঠাকুর, তুমি ওকে দর্শন দিলে, কৃপা করলে আমাকে দিলে না, এই দুঃখ বা অভিমান হয়ে গেল। এই ক্ষোভটা খারাপ না। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব যেমন বলেছেন—‘রামপ্রসাদকে দেখা দিলি, আমাকে দেখা দিলি না।’ এগুলোতে বরং ভক্তি পথে এগিয়ে যাবার প্রেরণা পাওয়া যায়। তবে কোনও ভক্তকে ঠাকুর কৃপা করলেন, তাই দেখে মনে ভীষণ ঈর্ষা আক্রোশ এলো এবং চেষ্টা করতে লাগল তাকে কী ক’রে সরিয়ে নামিয়ে তার নিন্দে করে ঠাকুরের কাছ থেকে দূরে আনা যায়। এটা কিন্তু খুবই ক্ষতিকর। ঈর্ষা থাকলে হবে না। ভগবান থেকে নিজেই দূরে সরে যাবে। সেটা হীনতার পর্যায়ে পড়বে, ভক্তির পর্যায়ে পড়ে না।
শ্রীঅর্চনাপুরী মায়ের বাণী ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে