Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

খাদ্যেও গেরুয়া ফতোয়া!

খাদ্যেও গেরুয়া ফতোয়া!
  • ১২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চোখে ‘বড় অন্যায়’ করে ফেলেছিলেন লালুপ্রসাদ ও তাঁর ছেলে তেজস্বী যাদব এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁরা মাছ-মাংস খাওয়ার ভিডিও প্রচার করে হিন্দুদের আঘাত করে সংখ্যালঘুদের তুষ্ট করতে চেয়েছেন—মত ছিল মোদির। ঘটনাটা এইরকম: বছর দুয়েক আগে এক ভরা শ্রাবণে লালুপ্রসাদের দিল্লির বাড়ি যান রাহুল। অতিথি আপ্যায়নে রাহুলকে নিজের হাতে মাংস রান্না করে খাওয়ান লালু। রান্না ভালো লাগায় বোন প্রিয়াঙ্কার জন্য মাংস চেয়ে নিয়ে যান তিনি। পরে সেই রান্না মাংস ও খাওয়ার ছবি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন রাহুল। অন্যদিকে, ২০২৪-এর নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে লালুর ছোট ছেলে তেজস্বী যাদবের মাছ খাওয়ার ভিডিও পোস্ট করেন জনৈক ব্যক্তি। বিরোধী তিন নেতার এই ‘অন্যায়’ মেনে নিতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। পরে কাশ্মীরে এক সভায় নাম না করে প্রসঙ্গটি তুলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, নবরাত্রি ও শ্রাবণ মাসে আমিষ খেলে তা ‘মুঘল মানসিকতার’ প্রকাশ। এটা হিন্দু ভাবাবেগে আঘাত। দলের সর্বময় কর্তার এমন ভাষ্যে প্রবল উৎসাহিত চ্যালাচামুণ্ডাদের তারপর থেকে দেখা যায়, মূলত উত্তর ও উত্তর পশ্চিমের রাজ্যগুলির বাজারে হানা দিয়ে মাছ-মাংস বিক্রির দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে! এই জুলুমবাজির সর্বশেষ সাক্ষী দিল্লির বাঙালি অধ্যুষিত চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকার বাজার।

Advertisement

দীর্ঘদিন পর দিল্লিতে ক্ষমতায় ফিরেছে বিজেপি। এসেই দাঁত-নখ বের করতে শুরু করে দিয়েছে বলে অভিযোগ। দিন কয়েক আগে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে (ভিডিও সত্যতা বর্তমান যাচাই করেনি) দেখা যাচ্ছে, চিত্তরঞ্জন পার্কের ১ নম্বর মার্কেটের মাছবাজার বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছে গেরুয়াবাহিনীর ‘স্বঘোষিত’ দুই সদস্য। কয়েক দশকের পুরনো এই মাছবাজারে বিক্রেতারাই একটি কালীমন্দির তৈরি করেছিলেন। সেই বাজারে নিষ্ঠাসহকারে পুজোপার্বণ পালিত হয়ে আসছে এতকাল। এই নিয়ে কোনও সমস্যাই তৈরি হয়নি এতদিন। কিন্তু কেন মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে মাছের বাজার থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং আমিষ খাওয়া কেন শাস্ত্র বিরোধী সেই ব্যাখ্যা দিয়ে মাছবাজার তুলে দেওয়ার হুমকি দেন ওই যুবকেরা। যদিও বিজেপি’র কারও কারও বক্তব্য ভিডিওটি ভুয়ো। তবে শুধু এখানেই নয়, চিত্তরঞ্জন পার্ক থেকে ৫০০ মিটার দূরে গোবিন্দপুরী মাছবাজার গত ২৮ মার্চ বন্ধ করে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। নবরাত্রি বলে সেই মাছবাজার বন্ধ করা হলেও এখনও তা খোলেনি। বস্তুত গত কয়েক বছর ধরেই দিল্লি-উত্তরপ্রদেশে দুর্গাপুজো সংলগ্ন প্রাঙ্গণে আমিষ খাবারের স্টল কেন থাকবে—তা নিয়ে পুজো কর্তাদের সঙ্গে বিশ্বহিন্দু পরিষদের বিবাদ বারবার প্রকাশ্যে এসেছে। তাই চিত্তরঞ্জন পার্কের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। হিন্দুদের নানা পুজো পার্বণের সময়ে আমিষ খাবারের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যে। উত্তর ভারতের মানুষ বছরে দু’বার নবরাত্রি পালন করেন। অতএব নবরাত্রি, রামনবমীর সময়ে এবং শ্রাবণ মাসে মাছ-মাংস খাওয়া ও বিক্রি বন্ধে সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। যেমন, গোহত্যা বন্ধের নামে গোরুর মাংস খাওয়া, বিক্রি ও পরিবহণে একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই ইস্যুতে গরিব মানুষকে পিটিয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। খাদ্যের মতো পোশাকেও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কোথাও কোথাও। দিল্লিতে সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘কাপড় সে পাতা চাল যাতা হ্যায়...’।
অথচ পরিসংখ্যান বলছে, মোদির নিজের রাজ্য গুজরাত এবং গোবলয়ের একটি অংশ বাদ দিলে দেশের সিংহভাগ রাজ্যের অধিকাংশ মানুষই আমিষাশী। চিকিৎসা বিজ্ঞানী অনেকের মতে, মাছেই সবচেয়ে সস্তায় বেশি প্রোটিন মেলে। দুর্ভাগ্যজনক হল, প্রধানমন্ত্রী থেকে হিন্দুত্ববাদীরা মুঘলদের সঙ্গে আমিষকে এক পংক্তিতে বসিয়ে ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। যদিও ইতিহাস বলছে, এদেশে মুঘলরা পা রাখার আগেই মানুষের পাতে পড়েছে আমিষ পদ। এমনকী রামচন্দ্রের যাপনেও নাকি আমিষের সন্ধান মেলে। মানুষ এতদিন শুনে এসেছে ‘আপ রুচি খানা’র কথা। আসলে হিন্দু ধর্মে বহুত্ব ও বৈচিত্র্য সুবিদিত। যেমন, গণেশ-বজরঙ্গবলীর নিরামিষাশী ভক্তরা হিন্দু। আবার কালী-দুর্গার আমিষ ভক্তরাও হিন্দু। কিন্তু এই সংস্কৃতি মানতে নারাজ বর্তমান সনাতনী হিন্দুদের একাংশ। তারা হিন্দু ধর্মের নামে হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন চালাচ্ছে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের নিরন্তর প্রচার চালিয়ে বন্ধুত্ববাদের ধারণাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। তাই এখন তা পৌঁছেছে ভাতের থালায়। সুতরাং আজ যা দিল্লির মিনি কলকাতা চিত্তরঞ্জন পার্কে দেখা যাচ্ছে, কাল তা বাংলার কোনও প্রান্তে হয়তো শোনা যেতে পারে। নাগরিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধই এর একমাত্র দাওয়াই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ