পিনাকী ধোলে, সাঁইথিয়া: সিউড়ি থেকে সাঁইথিয়া যাওয়ার পথেই রোঙ্গাইপুর মোড়। সেখান থেকে বাঁ দিকে এগোলেই দেখা মেলে শুকিয়ে যাওয়া ময়ূরাক্ষীর। নদীর বুক চিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ রাস্তা। খাতায় কলমে যা সাঁইথিয়া পঞ্চায়েত সমিতি অনুমোদিত ‘ফেরিঘাট’। অভিযোগ, সরকারি সিলমোহর ব্যবহার করে এই ফেরিঘাটকে বালি মাফিয়াদের ‘সেফ প্যাসেজ’ বানিয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি। দুর্নীতির শিকড় যে কতটা গভীরে, তার প্রমাণ মেলে নদীর পাড়ে ফেরিঘাটের অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো রেট চার্টে। সেখানে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে— ‘ওভারলোড’ গাড়ি যাতায়াতের জন্য দিতে হবে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। ওভারলোড গাড়ি চলাচল দণ্ডনীয় অপরাধ এবং সরকারি রাজস্বের পরিপন্থী। কিন্তু একটি সরকারি তকমাধারী ফেরিঘাটেই প্রকাশ্য দিবালোকে টাকার বিনিময়ে সেই বেআইনি কারবারকে কার্যত আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
ময়ূরাক্ষীর বুক চিরে তৈরি হওয়া এই রাস্তাটি রোঙ্গাইপুর থেকে গিয়ে মিশেছে সাঁইথিয়া-মহম্মদবাজার সড়কের বাগডোলা এলাকায়। স্থানীয়দের যাতায়াতের দোহাই দিয়ে এই রাস্তা তৈরি হলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এর ব্যবহার হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রাস্তা দিয়ে এমন ভাবে ট্রাকের সারি দাঁড়িয়ে থাকে, সন্ধ্যার পর থেকে তো ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়াই যায় না। সেইসঙ্গে ধুলোর দাপটও রয়েছে। বিরোধীদের দাবি, সাধারণ মানুষের সুবিধা কিংবা সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির চেয়ে বালি মাফিয়াদের পকেট ভরানোকেই ‘পরম ধর্ম’ বলে মেনে নিয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি কর্তৃপক্ষ। তাই অবৈধ বালির গাড়ির যাতে অবাধে পারাপার হতে পারে, সেটাই এখন পঞ্চায়েত সমিতির মূল উদ্দেশ্য। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রশান্ত সাধু অবশ্য বলেন, সাঁইথিয়া শহরে যানজট এড়াতেই ওই ফেরিঘাটটি তৈরি করা হয়েছিল। যাঁরা লিজ নিয়েছেন, তাঁদের আমরা নির্দিষ্ট রেট চার্ট বেঁধে দিয়েছি। ওভারলোড গাড়ি যাতায়াতের কোনো অনুমোদন নেই। তারপরেও যদি এই ঘটনা ঘটে থাকে, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, ওই ফেরিঘাটের রাস্তা বরাবর রয়েছে বালিঘাট। দিনভর অন্তত সাত-আটটি দানবাকৃতি জেসিবি মেশিন দিয়ে অবিরাম বালি তোলা হচ্ছে। দুপুর গড়াতেই সেই অবৈধ বালি বোঝাই হতে থাকে বড় বড় ট্রাক এবং ডাম্পারে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, বালি পরিবহণের ঊর্ধ্বসীমা থাকলেও, এই ঘাটে সেসব নিয়মের বালাই নেই। এক একটি লরিতে অন্তত ৯০ টনের বেশি বালি চাপিয়ে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারি নিয়ম বলছে, এই পরিমাণ বালির অর্ধেকও নিয়ে যাওয়াও বেআইনি। এই বিপুল পরিমাণ বালি পাচারের ফলে সরকার যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনই ময়ূরাক্ষী নদী তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। লিজ নেওয়া এলাকার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে মাইলের পর মাইল বালি লুটের রাজত্ব কায়েম হলেও দেখার কেউ নেই। লাগামহীন বালি তোলার জেরে বিপন্ন ময়ূরাক্ষীও।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে পুলিশ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই পুরো চক্রটি আসলে পুলিশ, পরিবহণ দপ্তর এবং প্রশাসনের একাংশের প্রত্যক্ষ মদতে চলছে। পাশাপাশি, আমজনতার যাতায়াতের রাস্তাগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলেও মাফিয়াদের মসৃণ যাতায়াতের জন্য পঞ্চায়েত সমিতি রাস্তা বানিয়ে দিচ্ছে, এমন নজির সম্ভবত বিরল। দিনের শেষে সরকারি রাজস্ব ময়ূরাক্ষীর জলেই তলিয়ে যাচ্ছে, আর লাভবান হচ্ছে মাফিয়া ও প্রশাসনের অসাধু আধিকারিকরা। নদী ও পরিবেশের এই ধ্বংসলীলা কবে থামবে, নাকি সরকারি ‘ছাড়পত্র’ হাতে নিয়েই এভাবেই বালি লুট চলতে থাকবে, সে প্রশ্ন করার লোকের অভাব। প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা হবে।