নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত ও কলকাতা: স্বামীকে খতম করতে সচ্চিদানন্দ মিশ্র আসছে, এমনটা জানতেন তার মধ্যমগ্রামের প্রেমিকা। মধ্যমগ্রাম রবীন্দ্র মঞ্চের বিস্ফোরণ কাণ্ডের তদন্তে নেমে এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। রবিবার গভীর রাতের ওই বিস্ফোরণ কাণ্ডে মৃত্যু হয় সচ্চিদানন্দের। প্রেমের পথের কাঁটা প্রেমিকার স্বামীকে নিকেষ করার লক্ষ্যেই হরিয়ানার গ্লাস কারখানার কর্মী সচ্চিদানন্দ ইউটিউব দেখে বানিয়েছিল ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। পেন আকৃতির ওই আইইডি ‘সক্রিয়’ করার সময় তাতে বিস্ফোরণ ঘটলে মৃত্যু হয় ২৫ বছর বয়সি এই যুবকের। কে তার প্রেমিকা? কোথায় তাঁর বাড়ি? তদন্তে নেমে প্রথমে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় পুলিস। মধ্যমগ্রামের দাসপাড়া থেকে খুঁজে বের করা হয় সচ্চিদানন্দের প্রেমিকা ‘লালিমা’ (নাম পরিবর্তিত) এবং তাঁর স্বামী ‘গাজি’কে। মঙ্গলবার সকাল থেকে মধ্যমগ্রামের এই দম্পতিকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন বেঙ্গল এসটিএফের গোয়েন্দারা।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, আইটিআই-ফিটার সচ্চিদানন্দ যে আইইডি তৈরি করেছিল, তাতে স্বল্পমাত্রায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার করার পাশাপাশি ডিটোনেটরের ব্যবস্থা ছিল। কম ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও, তা একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পক্ষে যথেষ্ট বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ডিটোনেটর সক্রিয় করে পেন আকৃতির ওই আইইডিটি কোনওভাবে প্রেমিকার স্বামী ‘গাজি’র হাতে ধরিয়ে দেওয়াই ছিল সচ্চিদানন্দের উদ্দেশ্য। আর সে কারণেই প্রেমিকাকে ফোন করে স্বামী সহ তার সঙ্গে সাজিরহাট থেকে সোদপুরের মাঝে দেখা করার কথাও বলেছিল সে। রবিবার গভীর রাতে অভিষ্ট পূরণের লক্ষ্যে সেই আইইডি সক্রিয় করা মাত্রই, তা বিস্ফোরিত হয়।
তদন্তকারীরা বলছেন, ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেই এক বছর আগে সচ্চিদানন্দের সঙ্গে লালিমার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে বিবাহবর্হিভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে মধ্যমগ্রামের গৃহবধূ। এরপর থেকে মধ্যমগ্রামে আসা-যাওয়া শুরু করে সচ্চিদানন্দ। লালিমার বাবা জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি এবং এপ্রিল পরপর দু’বার এখানে এসেছিল উত্তর প্রদেশের ওই ছেলেটি। আমাদের বাড়িতেই উঠেছিল। মেয়ে জানিয়েছিল, ও বন্ধু। কিন্তু পরে শুনেছি, ওদের সম্পর্ক নিয়েই জামাইয়ের সঙ্গে অশান্তি শুরু হয় মেয়ের। তদন্তকারীদের ওই সূত্রটি জানিয়েছে, মধ্যমগ্রামে বাপের বাড়ি এলাকার যে বাড়িতে গত সাতমাস যাবত ভাড়া ছিল লালিমা ও গাজি, সেখানেও তাঁদের মধ্যে অশান্তি হতো। লালিমা পরিচারিকার কাজ করতেন। গাজি সাইকেল মিস্ত্রি। বাড়িওয়ালা গোবিন্দ চৌধুরি জানিয়েছেন, স্ত্রী’র বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলেন লালিমার স্বামী। মাঝেমধ্যেই অশান্তি হতো। কয়েকমাস আগে শেষবার যখন এই বাড়িতে উত্তর প্রদেশের ওই যুবক এসে দু’দিন ছিল, তখনও তুমুল অশান্তি হয়েছিল। এমনকী সচ্চিদানন্দ যে ফের মধ্যমগ্রামে আসছে, গত ১৮ আগস্ট সে খবর জানার পর অশান্তির আশঙ্কায় বউদি লালিমাকে সতর্ক করেছিলেন তাঁর ননদ। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, মাঝে একসময়ে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও শুরু করেন লালিমা। সেটা জানতে পেরে সচ্চিদানন্দ তাঁকে এবং তাঁর স্বামীর চরম ক্ষতি করার হুমকি দেয়। এমনকী এবার মধ্যমগ্রাম আসার আগেও গাজিকে খতম করার হুমকি দিয়েছিল। এহেন হুমকি শুনেও কেন লালিমা কাউকে বিষয়টি জানাননি, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।