


সময়টা ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিক। পাহাড়ের গায়ে তখনও শীতের আমেজ জড়ানো। প্রকৃতিও রোদ ঝলমলে। এমনই এক দিনে সড়ক সফরে কলকাতা থেকে পাড়ি জমালাম উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি গ্রাম চারখোল। পথে প্রথম রাতের হল্ট গাজলডোবা। এখানকার মস্ত ব্যারেজে এই সময় পাখিদের মেলা বসে। পায়ে হাঁটা জঙ্গলাকীর্ণ পথে খানিক দূর এগলেই ডোবার জলে পাখিদের আড্ডা উপভোগ করা যায়। ছবিশিকারিদের কাছে এই সময়টা গাজলডোবা যেন স্বর্গরাজ্য। দূর দূরান্ত থেকে কত যে পাখি উড়ে এসে জড়ো হয় এখানে। কিছু পরিচিত, কিছু বা অচেনা। ধূসর বকের পাশাপাশি যেমন দেখলাম হালকা বেগুনি রঙের বক। প্রথমে ফুল বলে ভ্রম হয়েছিল, জলের উপর নুইয়ে পড়া এক গাছের ডালে বসে ছিল চুপটি করে। কাছে যেতেই ভুল ভাঙল। বুঝলাম ফুল নয়, পাখি। বকেরই এক প্রজাতি। বেগুনি বক এই প্রথম দেখলাম। স্বভাবতই সচকিত, তড়িঘড়ি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমার স্বামী। কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে বক বাবাজি উড়ে গেল দূরে কোথাও। আমাদের পাশেই আর এক ভদ্রলোকও বসেছিলেন পাখির সন্ধানে। বললেন, ‘যা বুঝলাম, অন্তত সাতদিন টানা এখানে ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত এক নাগাড়ে বসে না থাকলে পাখির ছবি তোলা অসম্ভব।’ এদিকে পাহাড় আমাদের হাতছানি দিচ্ছে বারবার। অতএব পাখির সন্ধান মুলতবি রেখে পরবর্তী গন্তব্য চারখোলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
কালিম্পং জেলার অনন্য সুন্দর গ্রাম চারখোল। সম্প্রতি ভ্রামণিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এখানে হোমস্টে এবং রিসর্টের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। তাও বেশ নিস্তরঙ্গ এখানকার প্রকৃতি। বিস্তীর্ণ পাইনের বনে ঢাকা সরু পাহাড়ি পথঘাটের মাঝে যেন নৈঃশব্দ্যে নিজেকে মুড়ে রেখেছে নিঝুম, নিস্তরঙ্গ এই গ্রাম। উত্তরবঙ্গের আর পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের মতোই এখানকারও মূল আকর্ষণ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু তার দেখা যদি নাও বা মেলে তবু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য, শহুরে কোলাহল আর কেজো জীবন থেকে দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে এখানে আসা যায়। মনোরম প্রকৃতির মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার চেয়ে বিন্দুমাত্র কম নয়।
ব্রেকফাস্ট সেরে গাজলডোবা থেকে বেরিয়ে পড়লাম ন’টা নাগাদ। এখান থেকে চারখোলের দূরত্ব মোটামুটি ৭০ কিলোমিটার। গাড়িতে সময় লাগে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা। ওদলাবাড়ি পেরতেই রাস্তায় দুই ধারে শালের জঙ্গল আমাদের স্বাগত জানাল। কুচকুচে কালো পিচ ঢালা হাইওয়ে বিশেষ চওড়া নয়। রাস্তার দু’ধারে হালকা থেকে ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে শাল গাছের বনাঞ্চল। যেন রাস্তার অতন্দ্র প্রহরী। উপরে ঘন নীল আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি আর তারই গায়ে গিয়ে ঠেকেছে লম্বা শালের গাছ। বড়ো গোলপানা পাতাগুলো মেঘেদের সঙ্গে দোস্তি করতে ব্যস্ত। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ উপভোগ করতে করতেই দুরন্ত গতিতে ছুটছে আমাদের গাড়ি। খানিকটা পথ এগিয়ে বাঁহাতে একটা মেঠো পথ চলে গিয়েছে গভীর গহিন বনে। গাড়ি থামিয়ে সেই পথে খানিকদূর এগিয়ে চললাম আমরাও পায়ে হেঁটে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিতে বনের নৈঃশব্দ্য ভেঙে চুরমার হল। যত এগচ্ছি ততই ঘন হচ্ছে জঙ্গল। আর বেশি দূর যেতে সাহস হল না। কিন্তু ফেরার পথ ধরতেও মন চাইছে না এখনই। তাই খানিক দাঁড়ালাম বনমাঝে, মেঠো পথের ধারে জঙ্গলের সোঁদা গন্ধ উপভোগ করার জন্য। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হল জঙ্গলের মোহময় রূপ। দিনেরবেলাতেও সূর্যালোক এখানে ক্ষণিকের অতিথি। শালের পাতার ফাঁক দিয়ে বনের পথে জাফরি কাটা নকশা তৈরি করেছেন সূর্যদেব।
আমরা আবারও গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। লাভার পর থেকেই রাস্তা ক্রমশ পাহাড়ি হতে শুরু করল। রুক্ষ আর সংকীর্ণ রাস্তা ধরে উঠছে আমাদের গাড়ি। বাতাসে হিমেল হাওয়ার ছোঁয়াচ লেগেছে। জানলা খুলে সেই রোদ মাখা শীতল স্পর্শ মন ভরে অনুভব করতে করতে চলেছি। হঠাৎ দেখা হল, তিস্তার সঙ্গে। এখানে নদী খরস্রোতা কিন্তু ক্ষীণরূপী। দুর্দান্ত বেগে পাথর ডিঙিয়ে পাহাড়ি পথে নীচে নেমে আসছে সে। সবুজ জলে পাথরের ধাক্কা লাগলে ফেনার তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে চারপাশে। পথের বাধা অতিক্রম করে, পাথর ডিঙিয়ে কলকল শব্দ তুলে বয়ে চলেছে সে আপন মনে। পথের এই অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই পৌঁছে গেলাম চারখোল। ঘন পাইন বনে ঢাকা মনোরম নিস্তব্ধ গ্রাম। সম্পূর্ণ পর্যটন নির্ভর সেখানকার লোকেদের জীবনযাপন। জেলা সদর কালিম্পং থেকে মাত্রই কিলোমিটার তিরিশের দূরত্ব। কিন্তু দু’টি জায়গার চরিত্রে বড়োই অমিল। কালিম্পংয়ের শহুরে চাকচিক্য মোটেও নেই এই গ্রামের গায়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘাই এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। গোটা গ্রাম থেকে ৩৬০ ডিগ্রিতে পর্বতশ্রেণির শোভা দেখা যায়। সুউচ্চ হোটেল বা দোকান বাজার নেই বলে পাহাড়ের রূপ কোথাও আড়াল হয় না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে হিমালয় তার রূপমহিমায় কানায় কানায় পূর্ণ করে তোলে এই গ্রামটিকে। নীল আকাশ, মেঘ কুয়াশার লুকোচুরি আর ঘন সবুজ পাইন গাছের কোনাকৃতি রূপ যেন ভরিয়ে রেখেছে এই গ্রামখানা। আর আছে পাহাড়ি সারল্যমাখা মানুষগুলোর হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়ন। এই গ্রামের সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তই একটা দিন। তারপর নিঝুম অন্ধকারে যখন গ্রামখানা ঢেকে যায়, দূরে পাহাড়ের গায়ে ঝিকিমিকি আলো জ্বলে ওঠে তখন চুপিসারে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায় গ্রাম্য জনজীবন। সূর্যাস্তের প্রায় পিছুপিছুই রাতের অতল অন্ধকারে তলিয়ে যায় চারখোল।
গোটা গ্রাম জুড়েই শুধু উঁচু-নীচু পাহাড়ি পথ। পাহাড়ের গায়ে গাঁথা এখানকার ঘরবাড়ি, হোটেল, রিসর্ট সবই। তাই এক জায়গা থেকে অন্যত্র যেতে হলে পাহাড় ভাঙতেই হয়। রিসর্টগুলোর সমুখে শ্বেতশুভ্র পাহাড়শ্রেণি। চারপাশে পাইনের বন আর মাথার উপর নীল আকাশ। এখানে দমকা হাওয়ার দোলে দিনে দুপুরে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে যায় প্রকৃতির গায়ে। ঢেকে যায় রোদ ঝলমলে দিন, ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে যেন দুপুরে একটু ভাতঘুম দিয়ে নেয় চারখোল। তারপর আবারও কোনো দামাল হাওয়ার ঝটকায় কুয়াশা সরে ফর্সা রোদেলা আকাশ হেসে ওঠে গ্রামের উপর। অপূর্ব সেই মেঘ রোদ্দুরের খেলা। পাইনের বনের ভিতর দিয়ে উঠে নেমে আঁকাবাঁকা পথে খানিক দূর চলার পর পৌঁছে যাবেন ভিউ পয়েন্টে। ছাতা দিয়ে ঢাকা, পাহাড়ের গায়ে স্ল্যাব কেটে বেঞ্চ বানিয়ে বসার জায়গা করা হয়েছে। সেখানে উঠলে মনে হবে মহাশূন্যে পৌঁছে গিয়েছেন বুঝি। চারপাশ নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে পাখির কর্কশ ডাকে সেই নৈঃশব্দ্যে চিড় ধরছে। তারপর আবারও সব চুপচাপ। সমুখে কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি। এখান থেকে সূর্যাস্তের শোভা চমৎকার। সফেদ পাহাড়ের গায়ের লাল, কমলা রঙের ছটা একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে যেতে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে। পাহাড়ের গায়ে তখন ইলেকট্রিকের বাতি জ্বলে ওঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন জোনাকির সভা বসেছে দূর পাহাড়ের গায়ে। নিঝুম চারখোলের চোখে তখন ঘুমের পরশ লাগে। আগামী ভোরের অপেক্ষায় সেই দিনের খাতায় ইতি টানা হয়।
কমলিনী চক্রবর্তী