Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রাস্তার জঞ্জাল সাফাই সত্তরোর্ধ্ব অশোক পালের জীবনের ব্রত

রাস্তার জঞ্জাল সাফাই সত্তরোর্ধ্ব অশোক পালের জীবনের ব্রত
  • ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, লায়েকবাঁধ (বিষ্ণুপুর): ‘মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় কর।’ জনপ্রিয় গানের এই লাইনটাই বিষ্ণুপুরের লায়েকবাঁধ গ্রামের অশোক পালের জীবনের মন্ত্র। গ্রামের রাস্তায় জঞ্জালের স্তূপ তাঁর একেবারেই না পসন্দ। তাই ৭২ বছরের ওই বৃদ্ধ দৈনিক অন্তত কিলোমিটার পাঁচেক রাস্তা ঝাঁট দেন। তাও বিনা পারিশ্রমিকে!  
Advertisement
রবিবার যখন সবাই সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাচ্ছেন, তখন নিরলস অশোকবাবু ব্যস্ত তাঁর দৈনন্দিন সাফাই কর্মে। এদিন দুপুরে লায়েকবাঁধ গ্রামে পৌঁছনোর পর অশোকবাবুকে খুঁজে পেতে কোনও সমস্যা হয়নি। বলামাত্র পাড়ার যুবকরা তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। পাড়ার আবর্জনা সাফাই করে দুপুরে তিনি বাড়ির কাছের একটি কংক্রিটের রাস্তা ও মন্দিরের চাতাল একমনে পরিষ্কার করছিলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও পরিশ্রমে কোনও খামতি নেই। কানে কিছুটা কম শুনলেও গড়গড় করে রবীন্দ্র-নজরুলের কবিতা বলতে পারেন চতুর্থ শ্রেণি উত্তীর্ণ ওই বৃদ্ধ। চোখ ঝাপসা হয়ে এলেও স্মৃতি এখনও সতেজ। 
এই গ্রাম সাফ করার নেশার কারণ কী? অশোকবাবু বলেন, শৈশবে পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। বড় হয়ে সমাজের অনৈতিক কারবার বন্ধ করার কোনও কাজকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে চতুর্থ শ্রেণির পর বাবা আর আমাকে পড়াতে পারেননি। ফলে সমাজের জঞ্জাল সাফাই করার মতো কোনও পদে কাজ করতে পারিনি। তখন থেকেই পাড়ার জঞ্জাল সাফাইয়ের প্রতিজ্ঞা করি। অনেকে পাগল বলেছে, গালমন্দও কম করেনি। কিন্তু আমি নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসিনি। 
অশোকবাবুর স্ত্রী জবা পাল বলেন, ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় দশ বছর বয়সেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। তখন স্বামীর বয়স মেরেকেটে ১২ বছর। বিয়ের পর হঠাৎ একদিন ঝাঁটা হাতে রাস্তা সাফাই করতে বের হয়। হাজার বারণ সত্ত্বেও তিনি ঝাঁট দেওয়া বন্ধ করেনি। বাড়ির উনোনে হাঁড়ি চাপল কিনা তার খোঁজ না নিলেও প্রতিবেশীর দরজায় জঞ্জাল পড়ে আছে কিনা তার খবর রাখেন। শ্বশুর-শাশুড়ীর মৃত্যুর পর অন্যের দোকানে কাজ করে, চিঁড়ে বিক্রি করে আমি সংসার চালিয়েছি, দুই ছেলেকে বড় করেছি। প্রথম প্রথম স্বামীর উপর রাগ, অভিমান হতো। শোধরাবে না বুঝতে  পেরে আর কিছু বলি না। একসময় পাড়ার জঞ্জাল জড়ো করে বাড়ির সামনে থাকা কুয়ো ভরে ফেলে। এখন গ্রামের একটি গর্তে আবর্জনা জমা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা বছর বাষট্টির অনুপম চক্রবর্তী বলেন, আমার জ্ঞান হওয়া থেকেই অশোক দাকে গ্রামের রাস্তাঘাট ঝাঁট দিতে দেখেছি। সারাজীবন পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখলেও কোনও স্বীকৃতি পাননি। ওকে সরকার পুরষ্কৃত করলে খুশি হব। 
সম্পর্কিত সংবাদ