দু’বছরে জিএসটি ‘লুট’ সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি, সিস্টেমে গলদ, পরিকাঠামোর ফাঁক ভরাট করতে ব্যর্থ মোদি সরকার
  • ৯ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ঢাকঢোল পিটিয়ে চালু হয়েছিল ২০১৭ সালে। কর কাঠামো এবং কর ‘লুট’—একইসঙ্গে। ন’টি বছর পার হয়ে গিয়েছে। জিএসটির সৌজন্যে রাজস্ব বৃদ্ধির বড়াই যতই কেন্দ্র করে থাকুক, এখনও পরিকাঠামোর ফাঁক ভরাট হয়নি। আর সেই সুযোগ নিয়ে চলছে দেদার লুটতরাজ। প্রতি বছর। সম্প্রতি ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করেছে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব জিএসটি ইনটেলিজেন্স বা ডিজিজিআই। তারা জানাচ্ছে, ওই বছর মোটা অঙ্কের জিএসটি ফাঁকি দেওয়া সংস্থার সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। আর মোট কর ফাঁকি? ২ লক্ষ ২৩ হাজার কোটি টাকার। ঠিক তার আগের অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৩-২৪’কে সঙ্গে নিয়ে হিসাব কষলে জিএসটি ‘লুটে’র অঙ্কটা পৌঁছে যাচ্ছে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকায়! এই দুই বছরে কর ফাঁকি দেওয়া সংস্থার সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার। নজর করার মতো বিষয় হল, এত বড়ো ‘চুরি’। অথচ, এই বিপুল কর ফাঁকির পরও গ্রেপ্তার হয়েছে দু’বছরে মাত্র ৪৬১ জন! শুধু ২০২৪-২৫’এই ২৩৮ জন। মোট উদ্ধারের পরিমাণ মাত্র ৬১ হাজার টাকা। এই হিসাবেই স্পষ্ট, জিএসটি লুটের টাকা ফেরাতে, বা ‘লুটেরা’দের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে মোদি সরকার কার্যত ঠুঁটো। 

Advertisement

মনে রাখা ভালো, যাদের কর ফাঁকির অঙ্ক কোটি টাকার উপর, এই হিসাবে তাদেরই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কম অঙ্কের জিএসটি ফাঁকিকে এই আওতায় আনা হয়নি। দ্বিতীয়ত, সেন্ট্রাল বা সিজিএসটি দেখভাল করা অফিসগুলি থেকেই এই কর ফাঁকির হিসাব সামনে এসেছে। রাজ্য সরকারগুলির করের অঙ্ক এই পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তার ‘ফাঁকি’র হিসাব আলাদা। পুরো অঙ্কটা সামনে এলে এই পরিসংখ্যানকে হিমশৈলের চূড়া বলেই মনে হবে।
কীভাবে এত টাকার জালিয়াতি চলছে? ডিজিজিআইয়ের তথ্যই বলছে, ভুয়ো ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (আইটিসি) দেখিয়েই ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সবকারের ভাঁড়ার থেকে ২৯ হাজার ৬৭ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৭৯৬টি সংস্থার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ। এখান থেকে সরকার চাপ দিয়ে আদায় করতে পেরেছে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। ধরা পড়েছে ১০১ জন। সার্বিক কর ফাঁকির ক্ষেত্রে ভুয়ো আইটিসির রমরমাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও আছে, যে ‘আইটিসি’ প্রাপ্য নয় তার সুবিধা নেওয়া, অনলাইন মানি গেমিং, কর আদায়ের পর তা সরকারকে জমা না দেওয়া, করের ভাগ কম করে দেখানো সহ নানাবিধ কারণ। বিশেষজ্ঞদের কথায়, জিএসটি চালুর দিন থেকেই আইনি জটিলতার খপ্পরে পড়েছে মোদির সাধের এই কর ব্যবস্থা। শিল্পমহল থেকে বারবার তার প্রতিবাদ যেমন করা হয়েছে, তেমনই আইনি ফাঁক গলে করের কারচুপি করে গিয়েছে জালিয়াতরা। দিনের শেষে তার ফল ভুগতে হয়েছে সরকারকেই। যতই জিএসটি কর ব্যবস্থার সরলীকরণ করার কথা সরকার বলুক, বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না। সেই কর জটিলতার সুযোগ নিয়েই অধরা থেকে যাচ্ছে অপরাধীরা। ভুয়ো বিল, ভুয়ো সংস্থা, ভুয়ো ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট জালিয়াতির নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের বেশিরভাগই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হল, যারা শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ছে, তাদের শাস্তি হচ্ছে কি? সরকারের দাবি, ই-ইনভয়েসিং, জিএসটি অ্যানালিটিক্স, বায়োমেট্রিক আধার যাচাই, বিশেষ অভিযান চালিয়ে জালিয়াতি রোখা হচ্ছে। বাস্তবে কিন্তু ভুয়ো বিলের চক্র ছড়িয়ে পড়েছে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। কাগুজে সংস্থা খুলে, আসল ব্যবসা ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিল বানিয়ে আইটিসি তুলে নিচ্ছে জালিয়াতরা। তারপর সংস্থা বন্ধ করে উধাও! তদন্তে সময় লাগছে, আদায় কম হচ্ছে, আর মাস্টারমাইন্ডরা থেকে যাচ্ছে আড়ালেই। সাধারণ ব্যবসায়ী যখন একটা ভুল রিটার্নের জন্য নোটিস, জরিমানার মুখে পড়ছেন, সেখানে বড়ো জালিয়াতির মামলায় রাঘব বোয়ালরা থাকছে অধরাই। ফলে প্রশ্ন? জিএসটির সিস্টেম নিয়ে।