বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের কেরামতিতে হারাতে বসা পা ফিরে পেলেন মহিলা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটির বাসিন্দা মহাদেবী মণ্ডল (৩৮) ডান পায়ের ব্যথায় অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছিলেন। হাঁটু থেকে একেবারে নীচের দিকে। হাঁটতেই পারছিলেন না।
বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখিয়ে এক্স-রে ও এমআরআই করা হয়। ডান পায়ের হাঁটুর নীচের লম্বা হাড়ে (টিবিয়া) ধরা পড়ে বিশাল টিউমার। টিউমারটি এতটাই বড় এবং হাড়ের এমনই ক্ষয় করেছে, অধিকাংশ চিকিৎসকই জানান, বাঁচার পথ একটাই। ডান পা বাদ দিতে হবে। মহাদেবী তখন এলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। অদ্ভুত কৌশলে সেই পা বাঁচিয়েও দিলেন এখানকার অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসকরা। কোমরের হাড় দিয়ে তৈরি হল টিবিয়ার ‘ছাদ’। ব্যবহার হল ‘স্যান্ডউইচ টেকনিক’। ৪ ঘণ্টার অপারেশন শেষে বলতে গেলে ‘নতুন পা’ পেলেন মহাদেবী। সোমবার হয় অস্ত্রোপচার।
মেডিক্যাল সূত্রের খবর, উনি এখন হাঁটাচলাও শুরু করেছেন। প্রধান অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক তথা সহকারী অধ্যাপক ডাঃ সৈকত সাউ বলেন, হাসপাতালে থাকা, টেস্ট, ইমপ্ল্যান্ট, ডাক্তারদের ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ ধরলে প্রাইভেটে এই অপারেশনের খরচ হতো প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। এখানে কোনও খরচই লাগেনি।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, ডান পায়ে বিশাল জায়েন্ট সেল টিউমার হয়েছিল মহাদেবীর। মেডিক্যালে পরীক্ষানিরীক্ষা করেও চিকিৎসকদের প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, পা বাদ দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ খোলা নেই। ইউনিট ইনচার্জ ডাঃ সাউ বলেন, আসলে হাঁটুর নীচের মূল হাড় টিবিয়ার উপরের অংশটি কেউ যেন কুরে কুরে খেয়ে নিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে যাই করি না কেন, দাঁড়ালেই ভার নিতে পারত না হাড়টি। ভেঙে যেত। আবার শুধু লম্বা প্লেট লাগালেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকবে।
তাহলে? কীভাবে বাঁচানো গেল পা? কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সূত্রের খবর, এই ক্ষেত্রে ডান হাঁটুর অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টটি অক্ষুণ্ণ রেখে দিয়ে শুরু হয় অস্ত্রোপচার। টিবিয়ার মাথার অংশটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাড়ির ছাদের মতো হাড়টিকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তপোক্ত সাপোর্ট। চিকিৎসকরা মহাদেবীরই কোমরের হাড়ের একাংশ কেটে সেটিকে টিবিয়ার মাথায় ছাদের মতো ব্যবহার করেন। গোটা হাড়টিকে প্লেট দিয়ে একটি মেকানিক্যাল সাপোর্ট দেন। পাশাপাশি আসল, ক্ষয়ে যাওয়া হাড় থেকে টিউমার বের করে সেটিকে মজবুত করার জন্য স্যান্ডউইচ টেকনিকের সাহায্য নেওয়া হয়। ক্ষয়ে যাওয়া অংশে দেওয়া হয় বোন সিমেন্ট। উপরে কোমরের হাড় আর বোন সিমেন্টের মাঝখানে দেওয়া হয় জেলফোম নামে এক বিশেষ ধরনের পদার্থ। বোন সিমেন্ট দেওয়ার সময় তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। তাতে হাড়ের ক্ষতি হতে পারে। সেজন্য জেলফোম ব্যবহার করে দিয়ে সেই তাপ প্রশমিত করা হয়। একেই বলা হয় স্যান্ডউইচ টেকনিক।
যাঁর অস্ত্রোপচার হল, কী বলছেন তিনি? মহাদেবী বলেন, বাড়িতে আমার উপর নির্ভরশীল তিনজন। যখন প্রাইভেটের ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন, পা বাদ দিতে হবে, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। মেডিক্যাল আমায় পা ফিরিয়ে দিয়েছে। সোমবার অপারেশন হয়। এখন অল্প অল্প করে হাঁটতে শুরু করেছি। চিকিৎসক-নার্সদের ভালো হোক। ওঁদের কাছে আমি ঋণী।