Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বদলায় এক সুর

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ঘৃণ্য গণহত্যার আটচল্লিশ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার বারবেলায় বিহারের মধুবনীতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দেন, নিহত মানুষদের আত্মবলিদান বৃথা যাবে না।

বদলায় এক সুর
  • ২৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ঘৃণ্য গণহত্যার আটচল্লিশ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার বারবেলায় বিহারের মধুবনীতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দেন, নিহত মানুষদের আত্মবলিদান বৃথা যাবে না। এই জঙ্গি এবং তাদের মদতদাতা ষড়যন্ত্রকারীদের এমন শাস্তি দেওয়া হবে যা তাদের কল্পনার অতীত। প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টা পরে সন্ধ্যায় দিল্লিতে সংসদ ভবনে সরকারের ডাকা সর্বদল বৈঠকে সব বিরোধী দলের নেতারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, তাঁরা সরকারের পাশে আছেন। ভারতের মতো বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রায় সব ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তাল ঠোকাঠুকি দেখতেই অভ্যস্ত আম জনতা। কিন্তু যখনই দেশের সেনা, জওয়ান বা সাধারণ মানুষের উপর আঘাত নেমে এসেছে, নির্বিচার হামলা হয়েছে তখনই দেখা গিয়েছে ভারতের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অস্মিতা রক্ষায় প্রায় সব দল নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে এক সুরে জানিয়ে দিয়েছে, পাশে আছি। এমন নজির অবশ্য প্রথম নয়। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জম্মু কাশ্মীরের উরি ক্যাম্পে ঢুকে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। সেখানে ১৯ জন সেনা প্রাণ হারান। এই ঘটনার তিন বছর পর ২০১৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার অবন্তীপুরায় সিআরপিএফের ৭৮টি গাড়ির কনভয়ে বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি বোমা নিয়ে হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেবার প্রাণ যায় ৪০ জন জওয়ানের। উরির ঘটনার পর পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর সীমান্তে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে জঙ্গিদের একাধিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় ভারতীয় সেনা। পুলওয়ামার ঘটনার এগারো দিন পর পাকিস্তানের বালাকোটে ঢুকে জঙ্গিঘাঁটি তছনছ করে দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। সন্ত্রাসবাদ দমনে দুটি ক্ষেত্রেই সরকারের পাশে ছিল বিরোধীরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পহেলগাঁওয়ের হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গিদের মদতদাতা ও সাহায্যকারী পাকিস্তানকে হাতে-ভাতে-জলে মারতে চাইছে ভারত। এ জন্য ইতিমধ্যে ছ’দফা কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মোদি সরকার। বদলা নিতে আর কী কঠোর পদক্ষেপ করা হবে তার অপেক্ষায় ফুঁসছে গোটা দেশ। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের একযোগে সমর্থন ও পাশে থাকার বার্তা যে সরকারকে বাড়তি মনোবল ও ভরসা জোগাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ সন্ত্রাস মোকাবিলায় দেশের ১৪২ কোটি মানুষ এখন একই নৌকার যাত্রী। 

Advertisement

স্বস্তির এই বার্তার পাশে পহেলগাঁও কাণ্ডে মোদি সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়াটাও নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন ঘটনা। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভারত যে পাকিস্তানের চেয়ে বেশ অনেকগুণ এগিয়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু উরি, পুলওয়ামা কিংবা কাশ্মীরের আনাচেকানাচে নিত্য জঙ্গি তৎপরতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা আগাম খবর সংগ্রহের প্রশ্নে গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি। ঘটনা হল, অতীতে প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই এই ব্যর্থতা স্বীকার করেনি মোদি সরকার। পুলওয়ামা কাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট ছ’বছর পরে প্রকাশ্যে আসে। উল্টে প্রচার করা হয়েছে, কাশ্মীর কার্যত জঙ্গিমুক্ত হয়ে ফের পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আসল সত্য যে অনেকাংশে তা নয়, পহেলগাঁওয়ের হত্যালীলা তা বুঝিয়ে দিয়েছে। পার্থক্য হল, এবার এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নিরাপত্তায় গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ প্রশ্ন উঠেছে, কেন পহেলগাঁওয়ের ওই পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ছিল না? এখন ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ের’ মতো ভূস্বর্গের সর্বত্র নিরাপত্তায় ঢেকে দেওয়া হলেও প্রশ্ন উঠেছে ব্যর্থতার দায় মেনে কোনও অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ করবে কি মোদি সরকার?   নাকি পরে সবটাই ধামাচাপা দেওয়া হবে? 
পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় রাজনীতি সরিয়ে রেখে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিরোধীরা। কিন্তু শাসকদল কি তাতে তাদের হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে? পুলওয়ামার ঘটনার পর উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার চালিয়ে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ফায়দা তুলেছিল মোদির দল। এবার সামনে লোকসভা ভোট না থাকলেও পহেলগাঁওয়ে হিন্দুনিধন যজ্ঞকে সামনে রেখে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে আরও উস্কে দিতে চাইছে গেরুয়াবাহিনী। এই মর্মান্তিক ঘটনাকে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করতে চাইছে পদ্মশিবির। খবরে প্রকাশ, কয়েকটি রাজ্যে কাশ্মীরিদের উপর হামলা হয়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, নিহতদের মধ্যে একমাত্র মুসলিম যুবকটি এক জঙ্গির অস্ত্র কাড়তে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছেন। ভুলে গেলে চলবে না, একাধিক কাশ্মীরি মুসলমান যুবক জীবনের পরোয়া না করে আহত হিন্দুদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন নিজেদের কাঁধে চাপিয়ে। ভুলে গেলে চলবে না, জঙ্গিদের খোঁজে তল্লাশি চালাতে গিয়ে বৃহস্পতিবার কাশ্মীরের উধমপুরে যে বাঙালি জওয়ান গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে শহিদ হয়েছেন ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি একজন মুসলমান। ভুলে গেলে চলবে না, পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর প্রায় গোটা কাশ্মীর পথে নেমে জঙ্গি ও তার মদতদাতাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তাই এই সঙ্কটের আবহে আপামর ভারতবাসী চায় পাকিস্তান ও তাদের মদতপুষ্ট জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিভাজনের ন্যক্কারজনক দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে জোরালো বার্তা দিন মোদি, শাহ, রাজনাথ সিং-রা। তাহলে দেশটা বাঁচবে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটা অক্ষত থাকবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ