নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: মেদিনীপুর সংগঠনিক বিজেপির নতুন জেলা সভাপতি ঘোষণা হয়েছে সপ্তাহ দু’য়েক হল। নব নির্বাচিত শমিতকুমার মণ্ডলকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখাও যাচ্ছে। কিন্তু এখনও তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া তো দূরের কথা, পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়নি। তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, গেরুয়া শিবিরের চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ছে সাংগঠনিক জেলায়। হাতে গরম প্রমাণ হিসেবে তাঁরা দেখাচ্ছেন বিজেপির জেলা কার্যালয়ের বর্তমান অবস্থাকে। জেলা সভাপতি হিসেবে শমিতবাবুর নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই জেলা কার্যালয়ে কার্যত শ্মশানের নিস্তব্ধতা। কর্মী-সমর্থকদের আনাগোনা একরকম নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন? নতুনকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে কেনই বা এত গড়িমসি? বিজেপির নেতা কর্মীদের একাংশেরই ব্যাখ্যা, শমিতবাবু প্রাক্তন সাংসদ দিলীপ ঘোষ অনুগামী বলেই পরিচিত। তাই দিলীপ বিরোধী শিবিরের কাছে তিনি না-পসন্দ। আবার দিলীপ দা’ও দীর্ঘদিন নিবিড় জনসংযোগে না থাকার কারণে তাঁর ঘনিষ্ঠদেরও একটা বড় অংশ নতুন সভাপতিকে মেনে নিতে পারছেন না। যুক্তি হিসেবে কর্মীদের দাবি, এলাকায় শমিতবাবুর জনসংযোগে ঘাটতি রয়েছে। বিরোধী শিবির তৃণমূলের অনেকেই তাঁকে চেনেন না। তা ছাড়া বর্তমানে রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাপুটে নেতার প্রয়োজন। নতুন সভাপতির মধ্যে সেই ব্যাপারটি নেই। যদিও শমিতবাবুর বক্তব্য, ‘বর্তমানে আমি অসুস্থ। তাই বাড়ি থেকে কম বেরোচ্ছি। এখনও দলের সমস্ত কর্মসূচি শুরু হয়নি। খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে। এরমধ্যে জেলা কার্যালয়ে গিয়েছিলাম।’
বিজেপির কর্মীরা ঘরোয়া আলোচনায় বলছেন, শমিত’ দা এসেছিলেন ঠিকই। কিন্তু এখনও সভাপতি পদের পুরোপুরি দায়িত্ব তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রাক্তন সভাপতি সুদাম পণ্ডিত পদের যাবতীয় কাজকর্ম হস্তান্তর করেননি। আগে নতুন জেলা সভাপতির নাম ঘোষণার দিন কিংবা পরের দিনই পদের হস্তান্তর করা হতো। এদিন সুদামবাবু বলছিলেন, ‘কেন হয়নি বলতে পারছি না। তবে, শীঘ্রই হবে। উনি ব্যস্ত রয়েছেন বলে মনে হয়।’
মেদিনীপুর জেলা সংগঠনের এহেন শ্রীহীন দশার নেপথ্যে ভোট-রাজনীতির ফ্যাক্টরও কাজ করছে। গত কয়েক বছরে বিজেপি একের পর এক নির্বাচনে পরাস্ত। মানসিকভাবে হতাশ কর্মী-সমর্থকরা। ‘সাজান বাগান’ থেকে দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে দেওয়াটাও ঠিক হয়নি বলে তাঁরা মনে করেন। তার উপর নতুন সভাপতি ঠিক করতে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিচুতলার কর্মীদের মতামত জানতে চাওয়া হয়নি। এভাবে উচ্চ নেতৃত্বের একের পর গলদে ভরা সিদ্ধান্তে কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছেন। তাঁরা এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না কোন যাদুমন্ত্রে তৃণমূলের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেওয়া যেতে পারে।
বিজেপির এক নেতা চায়ের আড্ডায় বলছিলেন, ‘একদা দিলীপ’দার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত তাপস মিশ্রকে জেলা সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে জেলা সভাপতির পদে বসানো হয় সুদাম পণ্ডিতকে। তিনিও দিলীপ ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। দু’জনেরই মেয়াদকালে ভালো ফল করতে পারিনি আমরা। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কাউকে ওই পদে বসানো উচিত ছিল, যিনি হাতের তালুর মতো চিনবেন গোটা জেলাকে। নিচুতলার কর্মীদের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়াবেন। সর্বপরি তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে একবগ্গা নীতি নিয়ে গোটা সংগঠনকে পরিচালনা করবেন। বলে দ্বিধা নেই, শমিত’দার মধ্যে এসব গুণাবলীর অভাব রয়েছে। তাই হয়তো তাঁকে দলের অনেকেই মানতে চাইছে না। সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেও যায়নি কর্মীদের একাংশ।’ জেলা বিজেপির এমন হাল দেখে মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ রফিক বলেন, ‘অপেক্ষা করুন। দলটাই দু’দিন বাদে উঠে যাবে। সামনের নির্বাচনে আর ওদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বাংলার মানুষ চায় না। এটা ওদের কে বোঝাবে!’