সংবাদদাতা, কাটোয়া: বৈষ্ণব কবি গৌরাঙ্গ পার্ষদ বাসুদেব ঘোষের জন্মভিটে সংরক্ষণ হোক, চাইছেন বাসিন্দারা। কেতুগ্রামের কুলাইয়ে এই কবির জন্মভিটে। সেটির যথাযথ সংরক্ষণ হলে বৈষ্ণব গবেষকদের সুবিধে হবে। স্থানীয়দের দাবি মেনে বিধায়ক শেখ শাহনেওয়াজ কবির জন্মভিটে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বৈষ্ণব কবির স্মরণ উৎসবে কয়েক হাজার ভক্তকে খাওয়ানো হয়। চৈত্র মাসের দোলপূর্ণিমার দ্বিতীয়া তিথি থেকেই বাসুদেব ঘোষের স্মরণ উৎসব উপলক্ষ্যে কেতুগ্রামের কুলাইয়ে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বৈষ্ণবতীর্থ কুলাইকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়লে বহু মানুষ নানাভাবে উপকৃত হবেন। বাসুদেব ঘোষ উৎসব কমিটির অন্যতম কর্তা তরুণ মুখোপাধ্যায় বলেন, বাসুদেব ঘোষের পুঁথি এখনও সযত্নে রাখা আছে। কেতুগ্রামের বৈষ্ণব তীর্থস্থানগুলিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য জেলার পর্যটন দপ্তরের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদের রাসোরা থেকে গোপাল ঘোষ তাঁর কনিষ্ঠপুত্র বল্লভ ঘোষকে নিয়ে চলে আসেন অজয় নদের কাছে পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের কুলাই গ্রামে। বল্লভ ঘোষেরই বংশধর বাসুদেব ঘোষ। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ অর্থাৎ ১৪৮২ সালে কার্তিকের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই কুলাইয়েই জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদের অন্যতম রচয়িতা, পাশাপাশি গৌর নাগরবাদের প্রবর্তক। বাসুদেব ঘোষ ছোট থেকেই বৈষ্ণব আবহে বড় হয়েছেন। অজয়ের ঘাটকুড়ি ঘাটে ছিল একটি প্রাচীন বটগাছ। সন্ন্যাস পরবর্তীকালে ১৫১০ সাল নাগাদ ভ্রমণ করতে করতে এই গাছের ছায়ায় শ্রীচৈতন্য দু’দিন দু’রাত বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই থেকেই ঘাটকুড়ি ঘাট মহাপ্রভুর বিশ্রামতলা হিসেবে পরিচিত। কুলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব সাধনার নানা ঐতিহ্য। ১৫০৯ থেকে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ অবধি বাসুদেব ঘোষ চৈতন্য সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তিনি দু’শোর উপর গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ রচনা করেছিলেন। আনুমানিক ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের রামনবমীর পর মদন ত্রয়োদশীতে মেদিনীপুর জেলার তমলুকে তাঁর প্রয়াণ হয়। বৈষ্ণব সাধকদের জন্মভূমি হওয়ায় কেতুগ্রাম- ১ ব্লকের কুলাই চিরকালই বৈষ্ণবদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
সেই কুলাই গ্রামে বাসুদেব ঘোষ স্মরণ উৎসবে মেতেছেন বাসিন্দারা। পালা কীর্তন, কবিগান প্রভৃতি হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্প এই উৎসবের আকর্ষণ। দূরদুরান্ত থেকে বহু কীর্তনীয়া আসেন এই বৈষ্ণব তীর্থস্থানে। কেতুগ্রামের বিধায়ক শেখ শাহনেওয়াজ বলেন, পর্যটন কেন্দ্র গড়ার জন্য আমি বিধানসভায় প্রশ্ন তুলেছিলাম। আশাকরি রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টাতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে।
কেতুগ্রামজুড়ে বৈষ্ণবদের নানা তীর্থস্থান ছড়িয়ে। কুলাইয়ে রয়েছে মহাপ্রভুর বিশ্রামতলা, বাসুদেব ঘোষের জন্মস্থান।
কেতুগ্রামের ঝামটপুরের ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’-এর রচয়িতা কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর বাড়ি। কৃষ্ণদাস কবিরাজ ১৫৮৫ সালের পর বৃন্দাবনে বসেই সেখানকার বৈষ্ণব গোস্বামীদের অনুরোধে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা মিশ্রণে প্রায় ২৪ হাজার চরণ বিশিষ্ট ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। এটা বাংলা সাহিত্য তথা ভারতবর্ষের বৈষ্ণব সংস্কৃতির একটি আকরগ্রন্থ। এসব ঘিরেই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিতে সরব বৈষ্ণব গবেষকরা।-নিজস্ব চিত্র